ভাব তরঙ্গ: বাউল গানে মুখরিত ময়মনসিংহের জয়নুল উদ্যান
অপসংস্কৃতির প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রেখে শেকড়ের সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে ময়মনসিংহে নিয়মিত বসছে বাউল গানের আসর ভাব তরঙ্গ।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল উদ্যানের ব্যাটবল চত্বর বধ্যভূমি প্রাঙ্গণে প্রতি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বসছে এই মরমী গানের আসর।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয় ভাব তরঙ্গ এর তৃতীয় পর্ব করিম পর্ব। রাত পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের কালজয়ী ও আধ্যাত্মিক ভাবধারার বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন স্থানীয় বাউল শিল্পীরা। ব্রহ্মপুত্রের হিমেল বাতাসের সঙ্গে দোতারা, একতারা, হারমোনিয়াম, ঢোল, মন্দিরা ও তবলার সুরে পুরো প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে মরমী গানের আসর।
দেশীয় সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ এ আয়োজনের উদ্যোক্তা।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মাটির কাছাকাছি থেকে বাউল সাধকদের সহজাত ও কোমল দর্শন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই ভাব তরঙ্গ আয়োজন করা হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যেন বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও মরমী গানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সে বিষয়টি আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১০ জুলাই লালনগীতি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ভাব তরঙ্গ এর যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্ব জালাল পর্ব। ওই আয়োজনে বাউল সাধক জালাল উদ্দীন খাঁর দেহতত্ত্ব ও সৃষ্টিতত্ত্বের গান পরিবেশন করেন স্থানীয় বাউল শিল্পীরা।
ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, এবার অনুষ্ঠিত হলো তৃতীয় পর্ব করিম পর্ব। এতে বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের বিভিন্ন ঘরানার গান পরিবেশন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সচেতন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের মাঝে ভাব তরঙ্গ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
এবারের করিম পর্বে শাহ আব্দুল করিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অসাম্প্রদায়িক ভাবনার গান তুমিও মানুষ আমিও মানুষ, সবাই এক মায়ের সন্তান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে গানের আসর শুরু করেন শিল্পীরা। এরপর একে একে গেয়ে শোনানো হয় মুর্শিদ ধন হে, গাড়ি চলে না, চলে না, আমি কুলহারা কলঙ্কিনীসহ তার বিভিন্ন জনপ্রিয় ও আধ্যাত্মিক গান।
আসরে গান পরিবেশন করেন বাউল সাধক জালাল শাহ চিশতি, জ্যেষ্ঠ বাউল শিল্পী আব্দুল জব্বার, বাউল স্বদেশ তালুকদার, বাউল মো. শহীদুল ইসলাম, বাউল মো. আব্দুল হাফিজ, বাউল মো. সিরাজ মণ্ডল ও বাউল বিল্লাল ফকিরসহ স্থানীয় শিল্পীরা।
গানের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের সুরের মেলবন্ধনও দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। হারমোনিয়ামে বাউল মো. শহীদুল ইসলাম ও স্বদেশ সরকার, ঢোলে আলমগীর হোসেন রানা, মন্দিরায় বিল্লাল হোসেন এবং তবলায় সৈয়দ আরমান হোসেন ইমনের বাদ্যযন্ত্রের যুগলবন্দিতে তৈরি হয় মোহময় পরিবেশ।
শিল্পীদের প্রতিটি পরিবেশনার শেষে করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। ব্রহ্মপুত্রের তীরে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে বসে বাউল গান শোনার এমন আয়োজন দর্শক-শ্রোতাদের কাছে তৈরি করে ভিন্ন এক আবহ।
আয়োজকরা বলছেন, লোকসংগীত শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে বাংলার মানুষের জীবন, দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও শেকড়ের সংস্কৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নিয়মিত এমন আয়োজনের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
হোসাইন সুলভ/এমআরএম



