তুচ্ছ ঘটনা কেন বড় হয় : মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ ডুবে থাকছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ সময় ঘটনাকে আবেগ দিয়ে বিচার করে ফেলে তাৎক্ষণিকভাবে; প্রতিক্রিয়াও জানায় দ্রুততার সঙ্গে। যাচাই-বাছাই না করেই মন্তব্য, শেয়ার ও আক্রমণ শুরু করে দেয়। একপর্যায়ে ছোট ঘটনা সমষ্টিগত গণহয়রানিতে রূপ নেয়, কিংবা নিতে পারে। অহরহ ঘটছে এ রকম ঘটনা।
অনলাইনে পরিচয় আড়াল করার সুযোগ থাকায় অনেকের আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে যায়। অনিয়ন্ত্রিত মানুষ আবেগের ঘোরে বেপরোয়া আচরণ করে ফেলতে পারে, করেও।
নারীরা কেন বেশি টার্গেট হন
সমাজের কিছু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এখনো নারীকে নিয়ন্ত্রণ ও অপমান করার প্রবণতায় ডুবে আছে।
অনলাইন হয়রানি আর অফলাইন সহিংসতা আলাদা বিষয় নয়, ভিন্ন জগতও নয়; অনলাইনের উত্তেজনা কখনো বাস্তব জীবনের আচরণকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে যখন ব্যক্তির পরিচয় বা ঠিকানা প্রকাশ করা হয়, হুমকি দেওয়া হয়, একাধিক ব্যক্তি একই ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে থাকে, গুজবকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় কিংবা প্রতিশোধের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে।
নারীর পোশাক, মতামত, ব্যক্তিজীবন, সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিচার করার সামাজিক প্রবণতাও আছে।
যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা ছবি ছড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে হয়রানির মোক্ষম অস্ত্র হয়ে ওঠে।
মনস্তাত্ত্বিক কারণ কী
রাগ, হতাশা, ঈর্ষা, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সহিংস আচরণকারীদের মধ্যে কাজ করতে পারে।
কেউ কেউ অন্যকে অপমান করে নিজের গুরুত্ব বা আধিপত্য অনুভব করতে চায়, আধিপত্য ছড়াতে চায়।
দলবদ্ধ এই ভুল-পদ্ধতি বা আক্রমণে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা কমে যায়।
‘সবাই করছে, আমিও করছি’—এ ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়।
গুজব ও উত্তেজনা ছড়ালে ভিড়ের মনস্তত্ত্ব কাজ করে; তখন যুক্তির চেয়ে আবেগ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কখন এটি সহিংসতায় রূপ নেয়
অনলাইন হয়রানি আর অফলাইন সহিংসতা আলাদা বিষয় নয়, ভিন্ন জগতও নয়; অনলাইনের উত্তেজনা কখনো বাস্তব জীবনের আচরণকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে যখন ব্যক্তির পরিচয় বা ঠিকানা প্রকাশ করা হয়, হুমকি দেওয়া হয়, একাধিক ব্যক্তি একই ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে থাকে, গুজবকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় কিংবা প্রতিশোধের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীর ওপর কী প্রভাব পড়ে
ভয়, লজ্জা, অপমান ও অসহায়ত্ব তৈরি হয়।
উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যা লাগাতার সমস্যায় পরিণত হয়, আত্মবিশ্বাসও ভেঙে যেতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী হয়রানিতে বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ট্রমাজনিত মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুক্তভোগীকে দোষী করা যাবে না।
প্রতিকার কী
ব্যক্তি পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে পাল্টা গালাগালি বা হুমকি না দেওয়া।
প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট, লিংক, সময় ইত্যাদি সংরক্ষণ করা।
সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্লক ও রিপোর্ট করা। গুরুতর হুমকি, যৌন হয়রানি বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা নেওয়া। পরিবার ও সমাজে ভুক্তভোগীকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পাশে দাঁড়ানো।
‘মেয়েটি কী করেছিল?’—এই ধরনের প্রশ্নের বদলে ‘হয়রানিকারী কেন এমন করল?’—এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করতে হবে, করা দরকার।
শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল আচরণ ও সম্মানবোধ শেখাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম ও রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়াতে হবে।
দ্রুত রিপোর্টিং ও কনটেন্ট অপসারণের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
যৌন হয়রানি, হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ দ্রুত করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিয়ে নিয়মিত জনশিক্ষা দরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু এটি যেন অপমান, প্রতিশোধ ও সহিংসতার অস্ত্র হয়ে না ওঠে। মতের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু কাউকে যৌনভাবে অপমান করা বা হুমকি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। অনলাইনে কোনো মন্তব্য করার আগে মনে রাখতে হবে, স্ক্রিনের ওপাশেও একজন মানুষ আছে, যার অনুভূতি আছে, মর্যাদা আছে।
লেখক: মনোচিকিৎসা বিদ্যার অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক, সাবেক একাডেমিক কোর্স ডিরেক্টর এবং পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।
এইচআর/এএসএম