পর্যটকে মুখর কক্সবাজার, জমজমাট মৌসুম শুরুর প্রত্যাশা
দরজায় কড়া নাড়ছে পর্যটন মৌসুম। ফেলে আসা বছরগুলোতে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেশে পর্যটন মৌসুম। তবে গত বছর থেকে কক্সবাজারে বর্ষাতেও উল্লেখযোগ্য পর্যটক উপস্থিতি বেড়েছে। যার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান।
খোলার দিনগুলোতে পর্যটক-দর্শনার্থীর আনাগোনা কম থাকলেও সাপ্তাহিক বা অন্য বন্ধের দিনগুলোতে লোকারণ্য হয়ে উঠছে কক্সবাজার সৈকত ও আশপাশ। পর্যটন মাস সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই শুক্র এবং শনিবার পর্যটকে মুখর হয় দরিয়ানগর কক্সবাজার। এ পরিস্থিতি দেখে আগামী মৌসুমটা জমজমাট যাবে, সেই আশা করছেন পর্যটন বোদ্ধারা।

সৈকতে পর্যটক নিরাপত্তায় কাজ করা সী সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী মুহাম্মদ ওসমান বলেন, পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার সৈকতের তিন পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। এখন সিগন্যাল চলছে। উত্তাল সগারের ঢেউ ঝাউবনের কিনারা ছুঁয়ে পড়ছে। তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও। কিন্তু এ বৈরী আবহাওয়ার মাঝেই ছুটির দিনে বিপুল পর্যটকের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে বেলাভূমি। সৃষ্টি হওয়া গর্ত এলাকায় ঝুঁকি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক লাইফগার্ড কর্মীরা। মাইকিংয়ের পাশাপাশি গর্তপূর্ণ স্থান থেকে পর্যটকদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, উত্তাল ঢেউয়ে নোনাজলের সান্নিধ্যে ভিড় জমিয়েছেন পর্যটকরা। কেউ মেতেছেন সমুদ্রস্নানে, কেউ টিউবে গা ভাসিয়ে উপভোগ করছেন ঢেউয়ের দোল। আবার সাগরের গভীরতার রোমাঞ্চ পেতে অনেকেই জেড স্কিতে ছুটছেন। তবে উচ্ছ্বাস যেন বেশি শিশু-কিশোরদের মাঝেই।
ফেনীর মহিপাল থেকে আসা শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বন্ধুরা মিলে কক্সবাজার এসেছি। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সমুদ্রের আবহ এত সুন্দর হয়, না দেখলে বুঝতাম না। ঢেউয়ের সঙ্গে গোসল করে অনেক মজা করেছি।
ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আরিফা জান্নাত বলেন, শুক্রবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছে বৃষ্টির কবলে পড়ি। মনটা খারাপ ছিল। কিন্তু বিকেল হতেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলেও বৃষ্টি আর বাগড়া দেয়নি। সবাই মিলে মেরিন ড্রাইভসহ নানা জায়গায় ঘুরেছি। অনেক আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরবো।
হোটেল সী নাইটের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, এবারের বর্ষায় প্রতিদিনই কমবেশি পর্যটক ছিল কক্সবাজারে। বন্ধের দিনগুলোতে এ উপস্থিতি উল্লেখ করার মতো। সেপ্টেম্বর শুরুর প্রথম সপ্তাহে মৌসুমের আবহ ছিল কক্সবাজার সৈকতজুড়ে। এবারের পর্যটন মৌসুম পরিচ্ছন্ন ও জমজমাট যাবে সেই আশা করছি সবাই।
হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা রিয়াদ ইফতেখার বলেন, কক্সবাজারকে দেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আমাদের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই বাজে হচ্ছে। সড়কের অনেক জায়গায় হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে যায়। বৃষ্টি চলমান থাকলে পানির অবস্থান বাড়ে, বৃষ্টি থামলে- এটি নেমে যেতে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করতে হয়। এসব বিষয় পর্যটকদের বিতৃষ্ণা দেয়।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, পর্যটন এলাকা হিসেবে আমাদের কামনা থাকে পুরো বছরই পর্যটকের আনাগোনা থাকুক। চলতি বছর বর্ষাতেও কক্সবাজারে পর্যটকের উপস্থিতি আমাদের আশান্বিত করেছে। তবে সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে ভারী বৃষ্টিতে অসংখ্য গর্ত হয়েছে। সৈকত এলাকা গুছিয়ে রাখা সম্ভব হলে কক্সবাজারের প্রতি পর্যটক আকর্ষণ বাড়ানো যায়। সৈকতের এক পয়েন্ট থেকে আরেক পয়েন্টে যাতায়াত সহজতর করতে সড়কগুলো পরিচ্ছন্ন করাও দরকার। দেশের সম্পদ হিসেবে কক্সবাজারকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

সাতলা বিলের লাল শাপলায় পর্যটনের হাতছানি
আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয় সূত্র মতে, গত ৪ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। যা বর্ষার শেষ মৌসুমে জেলায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। বৈরী আবহাওয়া এখনো থামেনি। উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপের প্রভাবে বাংলাদেশের নদীবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩নং সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি চলাচল করতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, প্রতিদিনই কমবেশি বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে ভারী বর্ষণ হয়। এ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগের মতো আবহাওয়ার পরিস্থিতি সঠিক বলা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, পর্যটন বিকাশমান একটি শিল্প। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে দেশে পর্যটন বিকাশ দ্রুত ঘটছে। তবে অতীতে নানা ঘটন-অঘটনের মাঝে সারাবছর পর্যটন স্পটগুলো লোকারণ্য হয়ে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরসহ নানা মেগা প্রকল্প কক্সবাজারকে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলছে। সেখানে পর্যটনও দ্রুত সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশাবাদী। গত বছর থেকে বর্ষাতেও পর্যটক উপস্থিতি সেই সমৃদ্ধির দিকে নিচ্ছে বলা চলে।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, বর্ষায় নিয়মিত পর্যটক উপস্থিতি এবং ছুটির দিনে বাড়তি চাপ পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশাবাদী করেছে। আমাদের প্রত্যাশা, এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই জমে উঠবে কক্সবাজারের পর্যটন মৌসুম।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, নব্বই দশক থেকেই পর্যটনে হাজার লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে উদ্যোক্তারা। কিন্তু বিনিয়োগের বিপরীতে আয় উল্লেখ করার মতো ছিল না। শুরু থেকেই কক্সবাজারে শীতকাল নির্ভরশীল পর্যটন। তাই বর্ষা-শরৎ বিদায় নিয়ে সেপ্টেম্বরে হেমন্তের শীতল হাওয়া বইতে শুরু করলেই পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝে আশা জাগে। কিন্তু চলতি বছরের বর্ষা-শরতেও পর্যটকের উপস্থিতি কমবেশি ছিল। সাধারণত বৃহস্পতি-শুক্র-শনিবার ছিল হোটেলে অতিথিদের চাপ। অন্য দিনগুলোতেও তুলনামূলক পর্যটন থাকায় এবার আগেভাগেই সিজন শুরুর প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। সারাবছর পর্যটন সমান্তরাল থাকলে উদ্যোক্তারা অতীতের ক্ষতি পোষাতে পারবেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) আজমল হোসেন বলেন, কাগজে-কলমে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটন মৌসুম গণ্য হলেও আমাদের দৃষ্টি সারাবছরই কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুম। সেই হিসাবেই আমরা সমুদ্রের সান্নিধ্যে আসা ভ্রমণপ্রেমীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেই প্রথম ও মুখ্য কাজ হিসেবে নিই। যেহেতু মৌসুম শুরু হচ্ছে, আমরা আরও পরিশীলিত হচ্ছি। বৈরী আবহাওয়ায় বিচের কিছু জায়গায় গর্ত হয়েছিল। এখন আবার তা মিলিয়ে গেছে। আমাদের বিচ বাইক, জেটস্কি, ওয়াচ টাওয়ার, পুলিশ বক্স সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, বেলাভূমির কবিতা চত্বর ও শৈবাল পয়েন্টে পর্যটকরা হেনস্তার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সেখানে স্থায়ী পুলিশ বক্স বসানোর কথা উল্লেখ করে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সামনের দিনে অতীতের চেয়ে আরও গোছালো টুরিস্ট পুলিশ পাবেন পর্যটকরা, এটি আশা করা যায়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, পর্যটন জোনের সুগন্ধা-লাবণী-কলাতলী পয়েন্টে লোকসমাগম একটু বেশি হয়। তবে সব পয়েন্টে পর্যটক উপস্থিতি চিন্তা করে তথ্যকেন্দ্র সচল রয়েছে। পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অতীতের মতো নিয়মিত মাঠে থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তবে সমুদ্রের সান্নিধ্যে এসে কারো জীবন যেন বিষাদময় না হয় সেদিকে খেলাল রাখতে ভ্রমণ পিয়াসীদের অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সমুদ্রের যে অংশে লাল পতাকা উড্ডয়ন থাকে সেখানে গোসল না করা উত্তম। লাইফগার্ড ও বিচ কর্মীদের নির্দেশনা মেনে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করা সচেতনতার পরিচয় বহন করে। নিরাপদ পর্যটনের জন্য স্ব স্ব সচেতনতা অতীত জরুরি।
এফএ




