অফিসে রসিকতার আড়ালে হয়রানি, বুঝবেন কীভাবে?
নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর একজন তরুণীকে তার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী বেশ আপন করে নিলেন। কাজ ভালো হলে প্রশংসা করেন, গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শ দেন। কখনো অফিসে দেখা হলে কাঁধে হাত রাখেন, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মজা করেন, আবার কাজের সময়ের বাইরেও খোঁজখবর নিতে মেসেজ পাঠান। সহকর্মীদের চোখেও বিষয়টি খুব স্বাভাবিক-‘স্যার তো ওকে মেয়ের মতোই দেখেন।’
শুরুতে তরুণীটিরও হয়তো খারাপ লাগে না। বরং নতুন কর্মস্থলে একজন সিনিয়রের কাছ থেকে এমন সহযোগিতা, গুরুত্ব ও প্রশংসা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। মনে হতে পারে, কর্মজীবনের শুরুতেই একজন ভালো মেন্টর পেয়েছেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন ব্যক্তিগত পরিসর আর পেশাগত সম্পর্কের সীমা অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখনই প্রশ্ন উঠতে পারে-কোনটা স্নেহ, আর কোনটা সীমারেখা অতিক্রম করা?
সব অস্বস্তিকর আচরণ কি প্রথমে বোঝা যায়?
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বলতে আমরা সাধারণত অশালীন মন্তব্য, যৌন ইঙ্গিত, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব কিংবা সরাসরি হুমকির মতো আচরণ বুঝি। কিন্তু বাস্তবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সব সময় এত স্পষ্টভাবে সামনে আসে না। অতিরিক্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন, বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ, শরীরে স্পর্শ করা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা-এসবও কারো জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
আর সমস্যা আরও জটিল হয় যখন এমন আচরণ করেন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাবান বা জ্যেষ্ঠ কেউ। কারণ তার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলে কাজ, মূল্যায়ন, দায়িত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে প্রভাব পড়তে পারে-এমন আশঙ্কা একজন জুনিয়র কর্মীর মনে থাকতেই পারে। তাই কেউ মুখে কিছু বলছেন না মানেই তিনি সবকিছুতে ঠিক আছে- এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
‘আমি তো মেয়ের মতো দেখি’-এই কথাটিই কি যথেষ্ট?
কাউকে নিজের সন্তানের মতো মনে করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু এই পরিচয় কোনো আচরণের স্বয়ংক্রিয় অনুমতি নয়।
একজন মেন্টর একজন তরুণ সহকর্মীর ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারেন, তার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারেন, প্রয়োজনীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে দিতে পারেন। কিন্তু এর সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনে অতিরিক্ত আগ্রহ, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা এমন রসিকতা জুড়ে গেলে সম্পর্কটি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আচরণের প্রভাব বোঝা। একজন মানুষ হয়তো খারাপ উদ্দেশ্যে কিছু করছেন না, কিন্তু তার আচরণ অন্য ব্যক্তির কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতেই পারে।
মেন্টর আর ‘অতিরিক্ত আপনজন’-এর পার্থক্য কোথায়?
একজন ভালো মেন্টর কখনোই তার পদমর্যাদাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে চান না। বরং তিনি এমনভাবে সহযোগিতা করেন, যাতে জুনিয়র সহকর্মী নিজের যোগ্যতায় সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।
কাজের প্রশংসা হবে কাজের জায়গায়। ভুল হলে পরামর্শ দেওয়া হবে পেশাগতভাবে। গুরুত্বপূর্ণ কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে। কিন্তু এসব সহযোগিতার বিনিময়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা ঘনিষ্ঠতা প্রত্যাশা করা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, মেন্টরশিপ মানে কারো ওপর অধিকার নয়, বরং কারো প্রতি দায়িত্ব।
নিজের জন্যও কিছু প্রশ্ন করুন
কোনো সম্পর্কের সীমারেখা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হলে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখা যেতে পারে। এই আচরণ কি অন্য সহকর্মীদের সঙ্গেও একইভাবে করা হয়? বিষয়টি কি অফিসের সবার সামনে করলেও স্বাভাবিক মনে হবে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি ক্ষমতার পার্থক্যের কারণে ‘না’ বলতে পারছেন না? কিংবা এমন কোনো আচরণ কি বারবার হচ্ছে, যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে?
সবচেয়ে সহজ প্রশ্ন হতে পারে-এই আচরণটি যদি প্রকাশ্যে সবার সামনে করা হতো, তবুও কি এটিকে পেশাদার মনে হতো? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে হয়তো একটু দূরত্ব তৈরি করার সময় এসেছে।
সুস্থ কর্মপরিবেশে সীমারেখাও জরুরি
একটি ভালো অফিস শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করে না, কর্মীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার পরিবেশও তৈরি করে। সেখানে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের মধ্যে সম্মান থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত সীমারেখাও থাকবে।
কেউ কাউকে ‘মেয়ের মতো’ দেখতেই পারেন, ‘ছোট বোনের মতো’ও ভাবতে পারেন। কিন্তু সেই সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখা।
কারণ সত্যিকারের যত্ন কখনো কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে না। একজন ভালো মেন্টর সুযোগ তৈরি করেন, আত্মবিশ্বাস বাড়ান এবং পথ দেখান-কিন্তু এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করেন না, যেখানে জুনিয়র সহকর্মীকে ভাবতে হয়, ‘এই বাড়তি মনোযোগের বিনিময়ে আমাকে কী দিতে হবে?’
কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক যতই আন্তরিক হোক, ব্যক্তিগত সীমারেখার জায়গাটি পরিষ্কার থাকাই সবার জন্য নিরাপদ। আর সেই সীমারেখা মেনে চলাই একজন মানুষের পেশাদারিত্বের অন্যতম বড় পরিচয়।
সূত্র: মিডিয়াম, দ্য নিউজ, হিন্দুস্তান টাইমস
এসএকেওয়াই




