সূর্যবংশীকে দেখিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেটকে কঠিন প্রশ্ন ওয়াসিম আকরামের
আইপিএলের মঞ্চে একের পর এক তরুণ প্রতিভার উত্থান। আর পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) সেই ধারাবাহিকতা কোথায়- প্রশ্ন তুললেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরাম। ভারতের বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে নিজের দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ও ক্রিকেট কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন তুলেছেন সূর্যবংশী। আইপিএলে টানা দুই মৌসুম দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পর জায়গা করে নিয়েছেন ভারতের জাতীয় দলেও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী অভিষিক্ত খেলোয়াড় হওয়ার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।
সূর্যবংশীর এই উত্থানকেই আইপিএলের সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন আকরাম। বিপরীতে পিএসএল ১০ বছর পার করেও কেন একইভাবে কোনো ব্যাটিং প্রতিভা তৈরি করতে পারছে না- সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
ইউটিউবার ফুরকান ভাট্টিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আকরাম বলেন, ‘পিএসএল শুরু হওয়ার ১০ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু পিএসএল কি একজন ব্যাটারও তৈরি করতে পেরেছে? হ্যাঁ, আমরা কয়েকজন বোলার তৈরি করেছি। কিন্তু বলুন তো, উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাটিং প্রতিভা কি তৈরি হয়েছে?’
এরপর সূর্যবংশীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ১৪ বছরের (বর্তমানে ১৫) সূর্যবংশীর মতো একজন ব্যাটিং প্রতিভা তৈরি করতে পারব, তখনই উন্নতি দেখতে পাব।’
আকরামের বক্তব্যে মূলত পাকিস্তানের ক্রিকেট কাঠামোর একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতাই উঠে এসেছে। তার মতে, শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজন করলেই প্রতিভা তৈরি হয় না। প্রতিভার মূল উৎস খুঁজে বের করতে শক্তিশালী ঘরোয়া ও ক্লাব ক্রিকেট কাঠামো প্রয়োজন।
‘ক্লাব ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে হবে’
পাকিস্তানের ক্রিকেটে উন্নতি করতে হলে ক্লাব ক্রিকেটকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন আকরাম। বিশেষ করে লাল বলের ক্রিকেটে পাকিস্তানের উন্নতির জন্য ক্লাব ক্রিকেটকে অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। আকরাম বলেন, ‘আমরা যদি লাল বলের ক্রিকেটে উন্নতি চাই, তাহলে ক্লাব ক্রিকেটকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।’
প্রতিভা অন্বেষণে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত বলেও মনে করেন সাবেক এই বাঁ-হাতি পেসার। তার প্রস্তাব, ‘পিসিবির উচিত করাচি ও লাহোরে ক্লাব ক্রিকেটের জন্য ১০ কোটি করে পাকিস্তানি রুপি ব্যয় করা। কারণ প্রতিভা আসে ক্লাব ক্রিকেট থেকেই।’
আকরামের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটার তৈরির ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে পিএসএলও তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ক্লাব ক্রিকেট থেকেই প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসবে, তারা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাবে এবং সেখান থেকে জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরি হবে- এটাই হওয়া উচিত পাকিস্তানের ক্রিকেট কাঠামোর পথ।
আইপিএলের সঙ্গে কেন তুলনা?
আইপিএলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আকরামের। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা নাইট রাইডার্সের বোলিং কোচ ও মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার সময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি দুটি আইপিএল শিরোপা জেতে।
অন্যদিকে পিএসএলেও কাজ করেছেন তিনি। ইসলামাবাদ ইউনাইটেড, মুলতান সুলতানস ও করাচি কিংসের সঙ্গে কোচিং ও মেন্টরিংয়ের দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন আকরাম। ফলে দুই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ভেতরের কাঠামো সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আইপিএলের প্রতিভা তৈরির ধারার সঙ্গে পিএসএলের তুলনা করেছেন তিনি।
ভারতে আইপিএল শুধু আন্তর্জাতিক তারকাদের মঞ্চ নয়, তরুণ ক্রিকেটারদের নিজেদের মেলে ধরার জায়গাও হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে উঠে আসা ক্রিকেটাররা আইপিএলে সুযোগ পেয়ে নিজেদের প্রমাণ করছেন। সূর্যবংশীর মতো ক্রিকেটার সেই ব্যবস্থার সাম্প্রতিকতম আলোচিত উদাহরণ। অন্যদিকে আকরামের মতে, পিএসএল বোলার তৈরিতে কিছুটা সফল হলেও ব্যাটিং প্রতিভা তৈরির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।
আকরামের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজে চরম বিপর্যয়ের মুখে পাকিস্তান। তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম দুই টেস্টেই হেরেছে বাবর আজমের দল। ফলে এজবাস্টনে তৃতীয় ও শেষ টেস্টেও হারের শঙ্কায় রয়েছে তারা।
প্রথম দুই ম্যাচে পরাজয়ের পর সিরিজে ইতিমধ্যে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পাকিস্তান। শেষ টেস্টেও হারলে ইংল্যান্ডের কাছে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হবে সফরকারীরা।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ক্রিকেট কাঠামো, ঘরোয়া ক্রিকেট এবং খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। আর সেই আলোচনাতেই আকরামের মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো- পিএসএলকে শুধু একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখলে চলবে না। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করতে হলে এই লিগের সঙ্গে তৃণমূলের ক্লাব ক্রিকেটের কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।
আইএইচএস/
