ব্যালন ডি’অরে ৬ষ্ঠ মেক্সিকান কুইনোনেস, সবারই স্বপ্ন এক
ব্যালন ডি’অর- বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর একটি। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর তারকা, বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের নায়ক- এই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় সাধারণত তাদেরই দেখা যায়। তবে মেক্সিকোর ফুটবলাররাও যে এই মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেন, তার প্রমাণ মিলেছে একাধিকবার।
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের মনোনীত তালিকায় জায়গা করে নিয়ে সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছেন হুলিয়ান কুইনোনেস। আল-কাদসিয়াহ ও মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া এই মনোনয়ন তাকে বানিয়েছে ইতিহাসের ষষ্ঠ মেক্সিকান ফুটবলার, যিনি ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকায় জায়গা পেলেন।
কুইনোনেসের আগে এই তালিকায় নাম উঠেছিল মেক্সিকোর আরও পাঁচ তারকা ফুটবলারের। তাদের মধ্যে ছিলেন গোলরক্ষক, ডিফেন্ডার, স্ট্রাইকার ও মিডফিল্ডার- প্রতিটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তারা।
ওচোয়া: মেক্সিকোর প্রথম
ব্যালন ডি’অরে মেক্সিকোর উপস্থিতির শুরু ২০০৭ সালে। সেই বছর প্রথম মেক্সিকান হিসেবে মনোনীতদের তালিকায় জায়গা করে নেন গুইলার্মো ওচোয়া।
তখন মাত্র ২২ বছর বয়সী ওচোয়া ছিলেন আমেরিকার গোলরক্ষক। গোলপোস্টের নিচে তার পারফরম্যান্স নজর কেড়েছিল ফুটবলবিশ্বের। যদিও চূড়ান্ত ভোটে খুব বেশি ওপরে উঠতে পারেননি তিনি, তবু ৩০তম হয়ে এক পয়েন্ট পেয়েছিলেন।
তবে ফলাফল যা-ই হোক, ওচোয়ার মনোনয়ন ছিল মেক্সিকান ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনিই প্রথম মেক্সিকান খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় জায়গা করে নেন।
মার্কেজের পালা
তিন বছর পর, ২০১০ সালে মেক্সিকোর আরেক কিংবদন্তি রাফায়েল মার্কেজ জায়গা করে নেন ব্যালন ডি’অরের প্রার্থীদের তালিকায়। বার্সেলোনার হয়ে খেলতে গিয়ে মার্কেজ নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কাতালান ক্লাবটির হয়ে লা লিগার পাশাপাশি দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপাও জিতেছিলেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়েও ছিলেন মেক্সিকোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেও মেক্সিকোর নেতৃত্বস্থানীয় ফুটবলারদের একজন ছিলেন মার্কেজ।
‘চিচারিতো’র উত্থান
২০১১ সালে ব্যালন ডি’অরের তালিকায় জায়গা করে নেন মেক্সিকোর অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার হ্যাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজ।
তখন তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। ইংলিশ ক্লাবটিতে নিজের প্রথম মৌসুমেই ২০ গোল করেছিলেন এই স্ট্রাইকার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে প্রিমিয়ার লিগ জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। একই সঙ্গে খেলেছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। তরুণ বয়সে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্সই চিচারিতোকে ব্যালন ডি’অরের মনোনয়ন এনে দেয়।
২০১৫- একসঙ্গে দুই মেক্সিকান
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে ব্যালন ডি’অরের দিক থেকে ২০১৫ সাল ছিল বিশেষ। ওই বছর একসঙ্গে দুজন মেক্সিকান ফুটবলার জায়গা করে নিয়েছিলেন মনোনীতদের তালিকায়- আন্দ্রেস গুারদাদো ও জিওভানি দস সান্তোস।
গুারদাদো তখন মেক্সিকো জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। জাতীয় দলের হয়ে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং গোল্ড কাপ জয়ে ভূমিকা তাকে এই স্বীকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যায়।
অন্যদিকে জিওভানি দস সান্তোস ইউরোপের ফুটবলে নিজের প্রতিভার ছাপ রেখেছিলেন। মেক্সিকোর আক্রমণভাগের এই তারকাও ২০১৫ সালে জায়গা করে নেন ব্যালন ডি’অরের মনোনীতদের তালিকায়। একই বছরে দুজন মেক্সিকান ফুটবলারের মনোনয়ন দেশটির ফুটবলের জন্য ছিল বড় অর্জন।
এবার ইতিহাসে কুইনোনেস
ছয় মেক্সিকানের এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হুলিয়ান কুইনোনেস। আল-কাদসিয়াহ ও মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে গত মৌসুমে তার পারফরম্যান্সই এনে দিয়েছে এই স্বীকৃতি।
আক্রমণভাগে তার গতি, গোল করার ক্ষমতা এবং জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাকে ২০২৬ সালের ৩০ জনের ব্যালন ডি’অর মনোনীতদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
ফলে ওচোয়া, মার্কেজ, চিচারিতো, গুারদাদো ও দস সান্তোসের পর ষষ্ঠ মেক্সিকান হিসেবে ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন কুইনোনেস।
কুইনোনেসের মনোনয়ন অবশ্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি মেক্সিকান ফুটবলের জন্যও নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ। কারণ ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পুরস্কারটি মূলত ইউরোপীয় ফুটবলের সেরা তারকারাই নিজেদের করে নিয়েছেন। বিশেষ করে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর হয়ে খেলা ফুটবলারদের আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি।
তবে কুইনোনেসের মনোনয়ন মেক্সিকোর ফুটবলারদের সেই বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার ধারাবাহিকতাই সামনে নিয়ে এসেছে।
ওচোয়া পথ দেখিয়েছিলেন ২০০৭ সালে। মার্কেজের মাধ্যমে মেক্সিকো পেয়েছিল বিশ্বমানের ডিফেন্ডারের প্রতিনিধিত্ব। চিচারিতো দেখিয়েছিলেন ইউরোপের বড় ক্লাবে গোল করার সামর্থ্য। গুারদাদো ও দস সান্তোস যোগ করেছিলেন আরেকটি অধ্যায়। এবার সেই গল্পের নতুন নায়ক কুইনোনেস।
মনোনয়ন থেকে পুরস্কার জেতার পথ অবশ্য অনেক দীর্ঘ। কিন্তু ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের তালিকায় জায়গা করে নেওয়াটাই একজন ফুটবলারের জন্য বিরাট স্বীকৃতি। আর কুইনোনেসের সামনে এখন সেই স্বীকৃতিকে আরও বড় কিছুতে পরিণত করার স্বপ্ন।
আইএইচএস/


