রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পে প্রাকৃতিক উপাদানের মেলবন্ধন

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
মাসুমুর রহমান মাসুদ নিবন্ধের শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যে শিরোনামে এই নিবন্ধ; তা অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচিত হওয়ার গুরুত্ব রাখে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধন রয়েছে। প্রকৃতিকে তিনি বহুমাত্রিক দিক থেকে ছোটগ...

মাসুমুর রহমান মাসুদ

নিবন্ধের শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যে শিরোনামে এই নিবন্ধ; তা অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচিত হওয়ার গুরুত্ব রাখে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধন রয়েছে। প্রকৃতিকে তিনি বহুমাত্রিক দিক থেকে ছোটগল্পে চিত্রিত করেছেন। গল্পে প্রকৃতি কখনো মানবমনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, যেন পাঠকমাত্রই বুঝতে পারে—‘মানুষ প্রকৃতিরই অংশ’। প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার চেয়ে, মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতির সক্ষমতা অনেক বেশি। তাঁর অখণ্ড ‘গল্পগুচ্ছ’ গ্রন্থে ৯৫টি ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া আরও গল্প রয়েছে। আজকের আলোচনা ‘হৈমন্তী’ গল্প অবলম্বনে।

প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’, ‘অপরিচিতা’ ও ‘সুভা’ গল্পগুলো চিরন্তন মানব ও নিসর্গের অনন্য রূপায়ণ। এখানে মানবজীবনের বেদনা এবং বাংলার রূপ একাকার হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতি কোনো পটভূমি নয় বরং তা মানবমনের অনুভূতি ও ভাগ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। ‘হৈমন্তী’ ও ‘অপরিচিতা’ গল্প দুটির প্লট নির্মিত হয়েছে তৎকালীন সমাজের প্রচলিত যৌতুক প্রথার ওপর নির্ভর করে। হৈমন্তী গল্পে অমানবিক যৌতুক প্রথার বলি হওয়া নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছে হৈমন্তী। গল্পটি এমন—পনেরো হাজার টাকা নগদ এবং পাঁচ হাজার টাকার গহনা দিয়ে সহজ-সরল ও সত্যভাষী হৈমন্তীর সঙ্গে অপূর্বর বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর হৈমন্তীর সততা ও মুক্তবুদ্ধি থাকার পরেও তার লোভী শ্বশুরবাড়ি এবং প্রথাগত সমাজের অমানসিক নির্যাতনের কারণে সে টিকতে পারেনি। অপূর্বর পরিবার হৈমন্তীর বয়স ও তার বাবার সরলতাকে সব সময় বাঁকা চোখে দেখত। শ্বশুরের পরিবারে একদিন পিতার ভীষণ অপমান মেয়েটি মেনে নিতে পারেনি। নির্মম মানসিক চাপ, অবহেলা ও দমবন্ধ পরিবেশ এই কোমলপ্রাণ তরুণীর জীবনকে গ্রাস করে নেয়। শেষ পর্যন্ত সমাজের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মেনে এবং হৃদয়ে গভীর কষ্ট নিয়ে হৈমন্তীর অকালমৃত্যু ঘটে, যা অপুকে ভীষণভাবে কষ্ট দেয়। তদুপরি তৎকালীন সমাজের রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তার শেষাব্ধি হয়ে ওঠেনি।

০২.
হৈমন্তী পিতার একমাত্র মেয়ে। মাতৃ বিয়োগের পর পিতার যত্নে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেছে। গল্পের শুরুতে হৈমন্তী সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাকে শিশিরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ভোরবেলা শিশির দিবাকর আলোয় বিলীন হয়ে যায়। হৈমন্তীও ঠিক তেমনি অপূর্বের জীবনে ক্ষণস্থায়ী ছিল। কথক তাকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, ‘আচ্ছা, তাহার নাম দিলাম শিশির। কেননা, শিশিরে কান্নাহাসি একেবারে এক হইয়া আছে, আর শিশিরে ভোরবেলাটুকুর কথা সকালবেলায় আসিয়া ফুরাইয়া যায়।’ শরৎচন্দ্র বিলাসী গল্পে বিলাসীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মত। হাত দিয়ে এতটুকু স্পর্শ করলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।’ ফুল এবং শিশির দুটিই প্রকৃতির অসামান্য উপাদান। হৈমন্তী গল্পে অপূর্বর শ্বশুরের পরিচয়ও প্রাকৃতিক উপাদান মিশ্রিত করে উপস্থাপিত হয়, ‘আমার শ্বশুরের নাম গৌরীশংকর। যে হিমালয়ে বাস করিতেন সেই হিমালয়ের তিনি যেন মিতা। তাঁহার গাম্ভীর্যের শিখরদেশে একটি স্থির হাস্য শুভ্র হইয়াছিল।’ বাস্তবে গৌরীশঙ্কর হচ্ছে হিমালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। এই পর্বতের চূড়ায় প্রচণ্ড ঠান্ডা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানুষ বসবাস না করলেও এর পাদদেশে এবং চারপাশের উপত্যকায় হাজার হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করে। বাস্তবের সেই শৃঙ্গ ওঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে অত্যন্ত সতর্কতা ও সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে।

হৈমন্তী গল্পের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে স্ত্রীর আসল পরিচয় উন্মোচন করে কথক। সেখানেও প্রকৃতির উপাদান মিশিয়ে পাঠককে নৈসর্গিক সুখ প্রদান করেন রবীন্দ্রনাথ। অপূর্ব বলে, ‘শিশির—না, এ নামটা আর ব্যবহার করা চলিল না। একে তো এটা তাহার নাম নয়, তাহাতে এটা তাহার পরিচয়ও নহে। সে সূর্যের মতো ধ্রুব; সে ক্ষণজীবিনী উষার বিদায়ের অশ্রুবিন্দুটি নয়। কী হইবে গোপনে রাখিয়া। তাহার আসল নাম হৈমন্তী।’ নারী চরিত্রের কোমলতা তুলে ধরতে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ কেউ নেই। হৈমর বর্ণনা দেওয়া হয়—‌‘দেখিলাম, এই সতেরো বছরের মেয়েটির উপরে যৌবনের সমস্ত আলো আসিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু এখনো কৈশোরের কোল হইতে সে জাগিয়া উঠে নাই। ঠিক যেন শৈলচূড়ার বরফের উপর সকালের আলো ঠিকরিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু বরফ এখনো গলিল না। আমি জানি, কী অকলঙ্ক শুভ্র সে, কী নিবিড় পবিত্র।’ সে শুভ্রতার ভালোবাসায় অপূর্ব তার পরিবারের বিরুদ্ধ পরিবেশের প্রতি কিছুটা বিরক্ত।

০৩.
তৎকালীন সমাজে গৌরীদান প্রথা প্রচলিত ছিল। আট বছরের মেয়েদের গৌরী, নয় বছরের মেয়েদের রোহিনী এবং দশ বছরের মেয়েদের কুমারী বলা হতো। কুমারী মেয়েদের বিয়ে না হওয়া, সেই সমাজে খুবই কুলক্ষণা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা ছিল। এদিকে হৈমর বয়স সতেরো। এটি অপূর্বরে পরিবারে সমস্যা তৈরি করেছে। হৈম যখন অন্যদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হয়ে নিজের বয়স না লুকিয়ে সত্যতার সাথে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করে; তখন অপূর্বর পরিবার হৈমন্তীর ওপর খুবই রূঢ় আচরণ করে। এর প্রতিবাদ করে অপূর্ব, অথচ দায় পড়ে হৈমন্তীর ওপর। ‘সে তো বটেই। দোষ সমস্তই হৈমর। তাহার দোষ যে তাহার বয়স সতেরো; তাহার দোষ যে আমি তাহাকে ভালোবাসি; তাহার দোষ যে বিধাতার এই বিধি, তাই আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্ত আকাশ আজ বাঁশি বাজাইতেছে।’ অপূর্বর এই যন্ত্রণাও প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃতির উপাদান দিয়ে। আবার হৈমর প্রতি অপূর্বর ভালোবাসাও প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃতির উপাদান দিয়ে—‘তাহার দুইটি কারণ ছিল—এক তো হৈমর ভালোবাসার মধ্যে এমন একটি আকাশের বিস্তার ছিল যে, সংকীর্ণ আসক্তির মধ্যে সে মনকে জড়াইয়া রাখিত না, সেই ভালোবাসার চারিদিকে ভারি একটি স্বাস্থ্যকর হাওয়া বহিত। দ্বিতীয়, পরীক্ষার জন্য যে বইগুলি পড়ার প্রয়োজন তাহা হৈমর সঙ্গে একত্রে মিলিয়া পড়া অসম্ভব ছিল না।’

০৪.
হৈমকে গিরিনন্দিনী হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। শ্বশুরের পরিবারে অপমানিত হয় হৈম। অপূর্ব জানায়, ‘আমাদের সংসারে অপমানের কণ্টকশয়নে সে বসিয়া; সে শয়ন আমিও তাহার সঙ্গে ভাগ করিয়া লইয়াছি। সেই দুঃখে হৈমর সঙ্গে আমার যোগ ছিল, তাহাতে আমাদিগকে পৃথক করে নাই। কিন্তু এই গিরিনন্দিনী সতেরো-বৎসর-কাল অন্তরে বাহিরে কত বড়ো একটা মুক্তির মধ্যে মানুষ হইয়াছে। কী নির্মল সত্যে এবং উদার আলোকে তাহার প্রকৃতি এমন ঋজু শুভ্র ও সবল হইয়া উঠিয়াছে। তাহা হইতে হৈম যে কিরূপ নিরতিশয় ও নিষ্ঠুররূপে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে এতদিন তাহা আমি সম্পূর্ণ অনুভব করিতে পারি নাই, কেননা সেখানে তাহার সঙ্গে আমার সমান আসন ছিল না।’

অপমানের পর হৈমর পরিবর্তন বিশেষ লক্ষণীয়। সে পরিবর্তন অপূর্ব ও তার বোন ছাড়া আর কারো নজরে আসেনি। সে বর্ণনাও প্রকৃতির উপাদান দিয়ে প্রকাশিত হয়। অপূর্ব পাঠককে জানায়—‘হৈম যে অন্তরে অন্তরে মুহূর্তে মুহূর্তে মরিতেছিল। তাহাকে আমি সব দিতে পারি কিন্তু মুক্তি দিতে পারি না—তাহা আমার নিজের মধ্যে কোথায়? সেইজন্যই কলিকাতার গলিতে ঐ গরারে ফাঁক দিয়া নির্বাক আকাশের সঙ্গে তাহার নির্বাক মনের কথা হয়; এবং এক-একদিন রাত্রে হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া দেখি সে বিছানায় নাই, হাতের উপর মাথা রাখিয়া আকাশ-ভরা তারার দিকে মুখ তুলিয়া ছাতে শুইয়া আছে।’

অসুস্থ হয়ে পড়লে হৈমকে ডাক্তার দেখানো হলো। সেখানে ডাক্তারের যে পরামর্শ, তাতেও প্রকৃতি মিশ্রিত করে রোগ নিরাময় পরামর্শই প্রতীয়মান হয়—‘শ্বশুরমশায় স্বয়ং একজন ভালো ডাক্তার আনিয়া পরীক্ষা করাইলেন। ডাক্তার বলিলেন, ‘বায়ু-পরিবর্তন আবশ্যক, নহিলে হঠাৎ একটা শক্ত ব্যামো হইতে পারে’।’ গল্পের শেষে অপূর্ব জানায়, ‘শুনিতেছি, মা পাত্রী সন্ধান করিতেছেন। হয়তো একদিন মার অনুরোধ অগ্রাহ্য করিতে পারিব না, ইহাও সম্ভব হইতে পারে। কারণ- থাক্, আর কাজ কী!’ গল্পের সমাপ্তিতে আমাদের মনে অতৃপ্তি থেকেই যায়। হৈম নেই সেটা স্পষ্ট। তার মৃত্যু নিয়ে পাঠক মনে রহস্যের জন্ম দিয়ে রবীন্দ্রনাথ শেষ করেন গল্পটি। তবে আমাদের মনে ছোটগল্পের সংজ্ঞাটি ভেসে ওঠে—‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হয়েও হইল না শেষ।’

০৫.
গল্পে প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি রবীন্দ্র দর্শনের প্রভাব রয়েছে। পিতাকে অঙ্গীকারের কথা বলা হলে তিনি মেয়েকে জানিয়েছেন—‘মানুষ পণ করে পণ ভাঙিয়া ফেলিয়া হাঁফ ছাড়িবার জন্য, অতএব কথা না-দেওয়াই সব চেয়ে নিরাপদ।’ আবার সৎপাত্রে কন্যাদানের বিষয়ে সম্প্রদান কারকের প্রভাব লক্ষণীয়, যা চিরন্তন সত্য প্রথা; পিতা যখন বলেন—‘যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম। এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে। অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার রাখিতে যাইবার মতো এমন বিড়ম্বনা আর নাই।’

পরিশেষে বলা যায়, ‘হৈমন্তী’ গল্পের হৈমন্তী সরলতার প্রতিমূর্তি, প্রকৃতির নানা উপাদান তার চরিত্রে কোমলতা, শুভ্রতা, সরলতাকে উজ্জল করেছে। সে কৃত্রিম সমাজের জটিলতা বোঝে না। শরৎকালের শিউলি ফুলের মতো তার স্নিগ্ধ উপস্থিতি চারপাশ আলোকিত করে তোলে। কিন্তু নির্মম সামাজিক নিয়ম তাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি। এই গল্পে হৈমন্তী চরিত্রে অন্তরের কোমলতা ও পবিত্রতা প্রকৃতির রূপের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সমাজ তার ওপর অত্যাচার চালালেও রবীন্দ্রনাথ তার প্রকৃতির মতো চিরন্তন ও মহিমাময় করে তুলেছেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা, কুমিল্লা।

এসইউ

Original Source
https://www.jagonews24.com/literature/article/1156629
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Culture