নেতারও ছাড় নেই, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে ঠান্ডা পানিতে চুবানো হয়!
কোনো শহরের প্রভাবশালী ব্যক্তি বছরের সবচেয়ে হাস্যকর বা বিতর্কিত কাজটি করলেন আর তার শাস্তি হলো নদীতে খাঁচাবন্দি করে ডুবিয়ে দেওয়া! তিনি কোনো ধনী ব্যবসায়ী হন কিংবা কোনো নেতা-রাজনীতিবিদ। শুনতে যেন মধ্যযুগের কোনো ভয়ংকর কাহিনি। কিন্তু উত্তর ইতালির ট্রেন্টো শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সঙ্গে সত্যিই জড়িয়ে আছে এমন দৃশ্য। নাম ‘লা তোঙ্কা’।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এখানে কোনো জীবিত রাজনীতিবিদ বা সেলিব্রিটিকে সত্যিই খাঁচায় ঢুকিয়ে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় না। পুরো আয়োজনটি একটি ব্যঙ্গাত্মক নাট্য পরিবেশনা, যেখানে অতীতের কঠোর শাস্তির অনুকরণ করা হয় প্রতীকীভাবে। এতে বলা হয় ‘লা তোঙ্কা’।
লা তোঙ্কা অনুষ্ঠিত হয় ট্রেন্টোর ঐতিহ্যবাহী ফেস্ট ভিজিলিয়ান উৎসবের অংশ হিসেবে। প্রতি বছর জুনে শহরের পৃষ্ঠপোষক সাধু সান ভিজিলিওকে ঘিরে এই উৎসব হয়। ঐতিহাসিক শোভাযাত্রা, নদীতে নৌকা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের পাশাপাশি ‘ট্রিব্যুনাল ডি পেনিটেনজা’ বা ‘শাস্তির আদালত’ও উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ২০২৬ সালের উৎসবও ১৯ থেকে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই আদালত অবশ্য কোনো বাস্তব আদালত নয়। এটি মূলত হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও নাটকের মাধ্যমে সাজানো একটি কাল্পনিক বিচার। শহরের সংবাদে আলোচিত কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে নিয়ে সেখানে অভিযোগ তোলা হয়। বিচারক ও তার সহযোগীরা মজার ছলে সেই ‘অপরাধ’ নিয়ে শুনানি করেন। শেষ পর্যন্ত কাউকে প্রতীকীভাবে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করা হলে তার জন্য অপেক্ষা করে লা তোঙ্কা।
খাঁচা নামবে নদীতে, কিন্তু কে থাকবে ভেতরে?
এই জায়গাটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল গল্পের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। আধুনিক অনুষ্ঠানে যে ব্যক্তিকে ‘দণ্ডিত’ করা হয়, তিনি নিজে নদীতে নামেন না। ট্রেন্টোর সরকারি সংস্কৃতি বিষয়ক সূত্র এবং উৎসব কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, একজন স্টান্ট ডাবল বা প্রতিনিধি সেই ব্যক্তির ভূমিকায় খাঁচায় থাকেন। সান লোরেঞ্জো সেতুর কাছ থেকে প্রতীকীভাবে সেই খাঁচা আদিজে নদীর পানিতে নামানো হয়। একই সময়ে বিচারকের মাধ্যমে ‘শাস্তির রায়’ পাঠ করা হয়।
অর্থাৎ এটি কোনো বাস্তব শাস্তি নয়, বরং দর্শকদের সামনে পরিবেশিত একটি ব্যঙ্গাত্মক নাটক। সেখানে রাজনীতিবিদ থাকতেই পারেন, আবার অন্য কোনো জনপরিচিত ব্যক্তি বা সামাজিকভাবে আলোচিত বিষয়ও ব্যঙ্গের লক্ষ্য হতে পারে। এমনকি একাধিক ব্যক্তিকেও প্রতীকীভাবে ‘দণ্ডিত’ করা সম্ভব।
এই রীতির রয়েছে ভয়ংকর অতীত
লা তোঙ্কার মজার বর্তমান রূপের পেছনে অবশ্য রয়েছে বেশ অন্ধকার ইতিহাস। ট্রেন্টোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই রীতি চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে প্রচলিত একটি শাস্তির পুনর্নির্মাণ। সেই সময় ধর্মনিন্দা বা ব্লাসফেমির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খাঁচায় বন্দি করে আদিজে নদীর পানিতে নামানোর শাস্তি দেওয়া হতো বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তখন আদিজে নদী শহরের প্রাচীরের আরও কাছ দিয়ে প্রবাহিত হতো। বন্দিকে খাঁচাসহ নদীতে নামানো হতো টোরে ভের্দে বা ‘গ্রিন টাওয়ার’ এলাকা থেকে।
বর্তমান উৎসবের আয়োজকরাও এই প্রাচীন শাস্তির কথাই উল্লেখ করেন। তবে আধুনিক লা তোঙ্কা সেই ভয়াবহ শাস্তিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এখন এটি হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে ইতিহাসকে স্মরণ করার একটি আয়োজন।
ভুলের হিসাব নেয় ব্যঙ্গাত্মক আদালত
আধুনিক লা তোঙ্কার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সামাজিক ব্যঙ্গ। বছরের বিভিন্ন সময়ে সংবাদে আলোচিত কোনো বিতর্ক, অদ্ভুত সিদ্ধান্ত কিংবা হাস্যকর কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠানের ‘বিচার’ পর্বে উঠে আসতে পারে। অর্থাৎ এখানে শাস্তির চেয়ে ব্যঙ্গটাই আসল। কাউকে অপমান করার জন্য নয়, বরং হাসির মাধ্যমে জনজীবনের নানা অসঙ্গতি সামনে আনার একটি সাংস্কৃতিক রীতি হিসেবে অনুষ্ঠানটি টিকে আছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও একে ‘ব্যঙ্গাত্মক’ বা ব্যঙ্গাত্মক আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আরও মজার বিষয় হলো, এই ঐতিহ্য শুধু ব্যক্তি বিশেষকে লক্ষ্য করে না। ট্রেন্টোর মানুষের কোনো দৃশ্যমান সামাজিক দুর্বলতা বা স্থানীয় কোনো আচরণও কখনো কখনো ব্যঙ্গের বিষয় হতে পারে। তাই ‘সবচেয়ে খারাপ রাজনীতিবিদকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়’ এমন সরল ব্যাখ্যা লা তোঙ্কার প্রকৃত চরিত্রকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।

ইতিহাস, হাসি আর জনসম্পৃক্ততার মিশেল
আজকের ট্রেন্টোতে লা তোঙ্কা তাই মধ্যযুগীয় শাস্তি ফিরিয়ে আনার কোনো প্রচেষ্টা নয়। বরং ভয়ংকর অতীতকে হাস্যরসের মোড়কে তুলে ধরার একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন। একদিকে পুরোনো ইতিহাসের স্মৃতি, অন্যদিকে সমসাময়িক সমাজ ও জনজীবন নিয়ে ব্যঙ্গ দুইয়ের মিশেলেই তৈরি হয়েছে এই অদ্ভুত অনুষ্ঠান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাই যদি দেখা যায়, ‘ইতালির একটি শহরে বছরের সবচেয়ে ভুল করা রাজনীতিবিদকে খাঁচায় ভরে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়’, তাহলে গল্পটির পুরোটা বিশ্বাস করার আগে একটু থামা দরকার। খাঁচা সত্যি, নদীও সত্যি, অনুষ্ঠানও সত্যি কিন্তু আধুনিক সময়ে নদীতে নামেন একজন অভিনয়শিল্পী বা স্টান্ট ডাবল, কোনো শাস্তিপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ নন। আর এখানেই লা তোঙ্কার আসল মজা একটি ভয়ংকর মধ্যযুগীয় শাস্তি কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়ে পরিণত হয়েছে হাসি, ব্যঙ্গ ও শহরের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশে।
কেএসকে




