শরতের শুভ্র মেঘমালা আর কাশফুলের মাঝে কিছুক্ষণ
নাজমুল হুসাইন
খবরের পেছনে ছুটতে ছুটতে কখনো সকাল, কখনো দুপুর, কখনো সন্ধ্যা—সময়ের হিসাব থাকে না ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের। ক্যাম্পাসের কোনো ঘটনা, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কিংবা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া—সবকিছুর খবর পৌঁছে দেওয়ার ব্যস্ততায় কেটে যায় প্রতিটি দিন। কিন্তু সেই ব্যস্ততার বাইরেও কিছু গল্প থাকে। যেখানে একসঙ্গে হাসা যায় কিংবা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটানো যায়।
শরতের নীল আকাশে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের দল। চারপাশে ঋতুর চিরচেনা শুভ্রতা। এমন এক বিকেলে খবরের ব্যস্ততা কিছুটা পাশে রেখে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান কমিটির সদস্যরা ছুটে গেলেন ঝিনাইদহের শৈলকুপার শ্রীরামপুরে—কালী নদীর বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃষ্টিনন্দন কাঠের সেতুর কাছে।
শ্রীরামপুর গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে কালী নদী। নদীর ওপর স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে কাঠের সেতুটি। একসময় যেখানে ছিল বাঁশের সাঁকো। সেখানে এখন কাঠের সেতু শুধু মানুষের যাতায়াতের পথই নয়। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে আকর্ষণের জায়গা। সেতুর পাশেই দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে বসার ব্যবস্থা, রান্নার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থা।
সেতুর কাছে পৌঁছাতেই যেন বদলে গেল ব্যস্ততার চেনা দৃশ্যপট। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা নিউজের তাড়া নয়—সামনে শুধু নদী, সবুজ, শরতের আকাশ আর চিরচেনা কাশফুলের ছোট ছোট বাগান। কাঠের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কখনো নদীর দিকে তাকানো, কখনো সাদা মেঘের দিকে চোখ রাখা, আবার কখনো নিজেদের মধ্যেই হাসি-আড্ডা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম আবহ।
সাংবাদিকদের জীবন অনেকটা এমনই—অন্যের গল্প খুঁজতে গিয়ে নিজেদের গল্প বলার সময় হয়ে ওঠে না। অথচ এই দিনটিতে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তারাই। নিউজরুমের তাড়া নেই, অ্যাসাইনমেন্টের চাপ নেই, ফোনের ওপাশে কোনো ব্রেকিং নিউজের অপেক্ষাও নেই। ছিল শুধু একসঙ্গে থাকার আনন্দ আর হাসি-আড্ডা।
কেউ ব্যস্ত ছিলেন ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও ধারণে, কেউ আবার সঙ্গীদের সঙ্গে আড্ডায়। আর কাঠের সেতুটি হয়ে উঠেছিল সেই দিনের নীরব সাক্ষী। নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস আর মাথার ওপর শরতের সাদা মেঘ যেন ব্যস্ত সাংবাদিক জীবনের মাঝে ছোট্ট এক বিরতির আয়োজন করেছিল।
শ্রীরামপুরের এই কাঠের সেতুর গল্পও আলাদা। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মিত সেতুটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে জায়গাটি ধীরে ধীরে বেড়ানোর স্থান হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। প্রেস ক্লাবের সদস্যদের এই সফর তাই কেবল একটু ঘোরাঘুরি ছিল না। এটি ছিল একই পেশার ব্যস্ত মানুষগুলোর নিজেদের জন্য একটু সময় বের করে নেওয়া। সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও সহজ, প্রাণবন্ত ও আপন করে নেওয়ার একটি সুযোগ।
দিন শেষে সন্ধ্যায় আবার ফিরতে হয়েছে ক্যাম্পাসে। ফিরেছে নিউজের ব্যস্ততা, ফিরেছে ফোনকল, অ্যাসাইনমেন্ট আর ছুটে চলার জীবন। কিন্তু শ্রীরামপুরের কাঠের সেতুতে কাটানো সেই বিকেলটুকু থেকে গেছে স্মৃতির পাতায়—শরতের সাদা মেঘের মতোই নির্মল এক স্মৃতি হয়ে। খবরের মানুষদেরও যে কখনো কখনো খবরের বাইরে এসে শুধু মানুষ হয়ে বাঁচতে হয়—শ্রীরামপুরের সেই দিনটি যেন তারই ছোট্ট এক গল্প।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এসইউ



