আলুর দরপতনে জয়পুরহাটে ত্রিমুখী সংকট
একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে আলুর দাম কমছে। উভয় সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। মাঠে ভালো ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকের মুখে এখন হতাশার ছাপ।
শুধু কৃষক নন, আলুর বাজারে দরপতনের প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ী ও হিমাগারের মালিকদের ওপরও। ফলে আলুর বাজারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ত্রিমুখী সংকট। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাট। এ জেলার পাঁচটি উপজেলায় মৌসুমের শুরু থেকেই আলুর বাজারে দামের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ।
কৃষক ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানায়, এ বছর আলু উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগারে সংরক্ষণ সবমিলে প্রতি বস্তা আলুতে খরচ হয়েছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে হিমাগারে আলু বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে থেকে ৮৭০ টাকা পর্যন্ত। এতে প্রতি বস্তা আলুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
যে কারণে এত সংকট
আলুচাষি মিজানুর রহমান তরিকুল ইসলামসহ একাধিক কৃষকের ভাষ্য, এ বছর ৫০ শতকে প্রতি বিঘা জমিতে আলুর বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও সেচ দেওয়াসহ সব মিলিয়ে কৃষকের খরচ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘা জমিতে আলু উত্তোলনের সময় বিক্রি করেছিলেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এতে করে ভরা মৌসুমেই আলুতে লোকসান হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
কৃষকদের দাবি, কৃষকের প্রথম সংকট উৎপাদন খরচ ওঠানো। মাঠে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, বাজারদর কমে যাওয়ায় সেই অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে কৃষকের হাতে নতুন করে বিনিয়োগের অর্থ থাকছে না।
লোকসান ও পুঁজি আটকে সংকটে ব্যবসায়ীরা
মো. আয়ুব আলী, জাকারিয়া ও বকুল হোসেনসহ একাধিক মৌসুমি ও আলুর পাইকারি বিক্রেতাদের ভাষ্য, এ বছর আলুর দরপতনের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলু ব্যবসায়ীরাও। বাজারদর কমে যাওয়ায় মজুত করা আলু প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না অনেক ব্যবসায়ী। ফলে হিমাগারে রাখা আলুর পেছনে বিনিয়োগ করা অর্থ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষকের ঘর থেকে শুরু করে হিমাগারে আলু রাখা পর্যন্ত তাদের খরচ হয়েছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে হিমাগার থেকে স্টিক প্রজাতির আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৭০ টাকা পর্যন্ত। এতে করে প্রতি বস্তা আলুতে লোকসান পোহাতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে দাম আরও কমে গেলে লোকসানের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে আলু কিনতে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে বাজারের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শঙ্কায় হিমাগার কর্তৃপক্ষ
কালাইয়ের এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক আবু রায়হান ও পাঁচবিবির কুসুম্বা আফিয়া কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বাড়লেও তারা ভাড়া বাড়াননি। আগের ভাড়াই নিচ্ছেন তারা।
তারা বলেন, এ বছর আলুর দরপতনের কারণে হিমাগার থেকে আলু বিক্রি করছেন না কৃষকরা। এতে করে একদিকে যেমন পাইকাররা অলস সময় পার করছেন, অন্যদিকে হিমাগার থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ আলু খালাস হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। এতে করে সময় মতো হিমাগার থেকে আলু খালাস নিয়েও শঙ্কায় আছে হিমাগার কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত ৩০℅ আলু হিমাগার থেকে খালাস হয়েছে।
জয়পুরহাট কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসানসহ কৃষি সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জেলার ২২টি হিমাগারে এ বছর প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুত রাখা হয়। এখন পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু খালাস হয়েছে ৩০ শতাংশ। আলুর দরপতন ঠেকাতে আলুর বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে রপ্তানি হলে আলুর দাম বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছর জেলার পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠে প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আলুর চাষাবাদ হয়েছে।
আল-কারিয়া চৌধুরী/এফএ


