ইমানের তৃতীয় শাখা: ফেরেশতাগণের ওপর বিশ্বাস
মানুষের দেখা জগতের বাইরেও রয়েছে এক বিশাল জগত। সেখানে এমন কিছু মাখলুকের বসবাস আছে যারা অদৃশ্য হলেও তাদের প্রতি ইমান আনা অত্যাবশ্যক। এমনই এক মাখলুক হলো ফেরেশতা।
ফেরেশতাগণ নুরের সৃষ্টি। তাদের প্রতি ইমানের মধ্যে কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
প্রথমত, তাদের অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস রাখা।
দ্বিতীয়ত, তাদের যথাযথ মর্যাদা ও অবস্থান স্বীকার করা এবং বিশ্বাস করা যে, তারা আল্লাহর বান্দা ও তার সৃষ্টি। তারা আল্লাহর আদেশপ্রাপ্ত ও দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা তাদের যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন, তারা কেবল ততটুকুই করতে পারে। তাদের মৃত্যুও সম্ভব। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য দীর্ঘ হায়াত নির্ধারণ করেছেন। তাদের এমন কোনো গুণে গুণান্বিত করা যাবে না, যার মাধ্যমে তাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা হয়। তাদের দেবতা বা পূজনীয় মনে করা যাবে না।
তৃতীয়ত, এ কথাও স্বীকার করা যে, তাদের মধ্যে ‘বার্তাবাহক’ রয়েছেন, যাদের তিনি মানুষের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তার কাছে প্রেরণ করেন। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তাদের কোনো ফেরেশতাকে অন্য ফেরেশতার কাছেও প্রেরণ করেন। এর সঙ্গে এ বিশ্বাসও অন্তর্ভুক্ত যে, তাদের মধ্যে আরশ বহনকারী ফেরেশতা রয়েছেন, কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফেরেশতা রয়েছেন, জান্নাতের রক্ষক রয়েছেন, জাহান্নামের রক্ষক রয়েছেন, মানুষের আমল লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতা রয়েছেন এবং মেঘমালা পরিচালনাকারী ফেরেশতাও রয়েছেন। (শুআবুল ইমান লি-বাইহাকি, ১/২৯৬)
আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে ফেরেশতাদের প্রতি ইমান সম্পর্কে বলেন: ‘রাসুল তার পক্ষ থেকে তার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে, তার প্রতি ইমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। তারা সবাই আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ ও তার রাসুলগণের প্রতি ইমান এনেছেন।’ (সুরা বাকারা: ২৮৫)
হাদিসে এসেছে: ‘ইমান হলো তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার সঙ্গে মোলাকাত, তার রাসুলগণের প্রতি এবং পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৫০)
ফেরেশতাদের গুণ সম্পর্কে কোরআন জানায়, তারা কখনও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেন না। তাদের যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা সেটিই করেন। (সুরা তাহরিম: ৬)
তারা অনেক ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাদের মধ্যে কেউ নবী-রাসুলগণের কাছে আল্লাহর ওহি পৌঁছে দেন। জিবরাইল (আ.) প্রধানত এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। কোরআন তাকে ‘রুহুল আমিন’ বা বিশ্বস্ত আত্মা হিসেবে উল্লেখ করেছে। (সুরা শুআরা: ১৯৩–১৯৪)
আবার ফেরেশতাদের কেউ মানুষের আমল লিপিবদ্ধ করেন, কেউ বান্দার হেফাজতের দায়িত্বে থাকেন, আবার কেউ জান কবজ করেন।
ফেরেশতাদের সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে যে বিবরণ এসেছে, তাতে তাদের বিশালত্বও ফুটে ওঠে। জিবরাইলকে (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.) তার প্রকৃত আকৃতিতে দেখেছিলেন। তার ছয়শ ডানা ছিল এবং তার বিশাল আকৃতি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করেছিল। (সহিহ মুসলিম: ১৭৭)
কোরআনও ফেরেশতাদের বিভিন্ন সংখ্যক ডানার কথা উল্লেখ করেছে। (সুরা ফাতির: ১) আবার সপ্তম আকাশের বাইতুল মামুরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ফেরেশতার ইবাদত করার কথা হাদিসে এসেছে। (সহিহ বুখারি: ৩২০৭) এসব বর্ণনা মানুষের সামনে এমন এক বিশাল সৃষ্টিজগতের ধারণা তুলে ধরে, যা তার দৃশ্যমান পৃথিবীর তুলনায় অনেক বিস্তৃত।
তবে ফেরেশতাদের প্রতি ইমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সম্ভবত মানুষের নিজের জীবনবোধে। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ তার চোখে দেখা পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়, তখন তার নিজের সীমাবদ্ধতাও তার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, বাস্তবতার সবকিছু তার ইন্দ্রিয়ের নাগালে থাকা জরুরি নয়। আবার যখন সে জানে, তার কথাবার্তা ও কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করার জন্য ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন, তখন তার আচরণে জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি হয়। কোরআন বলে, মানুষের ডানে ও বামে আমলের হিসাব গ্রহণকারী ফেরেশতা রয়েছে; সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা রেকর্ড করা হয়। (সুরা কাফ: ১৭–১৮)

ইমানের সর্বোচ্চ শাখা কী?
এখানেই অদৃশ্যের প্রতি ইমান দৃশ্যমান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মানুষ একা থাকলেও তার কাজ অর্থহীন নয়, তার কথা হারিয়ে যায় না, তার দায়িত্বেরও কোনো গোপন পরিসর নেই। ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস মানুষের মনে তাকওয়া, নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং আখেরাতের জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
এ কারণেই ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস গুরুত্বের দিক থেকে ইমানের তৃতীয় শাখা।
ওএফএফ


