ইন্টারনেটের আসল মালিক কে, আপনার বিলের টাকা কোথায় যায়?
মুঠোফোনে ইউটিউব খুলে একটি ভিডিওতে চাপ দিলেন। কয়েক মুহূর্তের ফোনের পর্দায় ভেসে উঠলো একটি ভিডিও। ভিডিওটি হয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো ডাটা সেন্টারে রাখা, আবার হতে পারে এর একটি কপি আছে আপনার শহরের কাছাকাছি কোনো সার্ভারে। যেখানেই থাকুক, এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কোনো আভাসই আপনি পেলেন না।
ফোনে তার নেই বলে অনেকেরই ধারণা, ইন্টারনেট বুঝি স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি বাতাসে ভেসে আসে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন, ফোন থেকে কাছের মোবাইল টাওয়ার পর্যন্ত সংযোগটুকু তারবিহীন হতে পারে, কিন্তু এরপরের প্রায় পুরো যাত্রাই চলে তারের বিশাল জালের ভেতর দিয়ে। মাটির নিচের অপটিক্যাল ফাইবার, সমুদ্রের তলদেশের সাবমেরিন কেবল, রাউটার, ডাটা সেন্টার ও ক্যাশ সার্ভার,সব মিলিয়েই আমাদের পরিচিত ইন্টারনেট।
ইন্টারনেট আসলে কী
সহজ ভাষায় বললে, ইন্টারনেট হলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য নেটওয়ার্কের একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা। একটি বাসা বা অফিসের কয়েকটি কম্পিউটার নিজেদের মধ্যে যুক্ত হলে ছোট একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। এমন লাখ লাখ ছোট-বড় নেটওয়ার্ক যখন নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত নিয়ম মেনে তথ্য বিনিময় করে, তখনই গড়ে ওঠে ইন্টারনেট। এ কারণেই একে বলা হয় ‘নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক’।
এর কোনো কেন্দ্রীয় সুইচ নেই, যা বন্ধ করলেই গোটা বিশ্বের ইন্টারনেট থেমে যাবে। দেশ, প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদাতার নিজস্ব নেটওয়ার্কগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বলেই পুরো ব্যবস্থা সচল থাকে।
একটি ক্লিকের পর যা ঘটে
আপনি ব্রাউজারে কোনো ওয়েবসাইটের নাম লিখলে ফোন বা কম্পিউটার প্রথমে রাউটার কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর ওয়েবসাইটটির ঠিকানা খুঁজে বের করতে হয়। মানুষ ডোমেইনের নাম মনে রাখে, কিন্তু নেটওয়ার্কের যন্ত্রগুলো যোগাযোগ করে আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে।
ডোমেইনের নামের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আইপি ঠিকানা মিলিয়ে দেয় ডোমেইন নেম সিস্টেম বা ডিএনএস। বিষয়টি অনেকটা মুঠোফোনের যোগাযোগ তালিকার মতো,আপনি নাম বাছাই করেন, ফোন ভেতর থেকে নম্বরটি খুঁজে নেয়। ঠিকানা পাওয়ার পর ব্রাউজার সংশ্লিষ্ট সার্ভারের কাছে তথ্য চায়। সার্ভার তখন প্রয়োজনীয় লেখা, ছবি বা ভিডিও পাঠাতে শুরু করে।
বড় একটি ভিডিও বা ফাইল একবারে আসে না। সেটি ছোট ছোট ডাটা প্যাকেটে ভাগ হয়ে রাউটার থেকে রাউটারে এগোয়। সব প্যাকেট যে একই পথ ধরে আসে, তা নয়। নেটওয়ার্কের অবস্থা অনুযায়ী পথ বদলাতে পারে। কোনো অংশ হারিয়ে গেলে সেটি আবার পাঠানো হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ফোন বা কম্পিউটার প্যাকেটগুলো সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ভিডিও, ছবি বা ওয়েবপেজ দেখায়। পুরো ঘটনাটি ঘটে চোখের পলকে।
সব ভিডিও বিদেশি সার্ভার থেকে আসে!
ইউটিউবে জনপ্রিয় কোনো ভিডিও চালালেই সেটি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দূরদেশ থেকে আসবে,এমন নয়। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বহুল ব্যবহৃত কনটেন্টের কপি বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের কাছাকাছি সার্ভারে রেখে দেয়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা সিডিএন।
স্থানীয় ক্যাশ সার্ভারে ভিডিও থাকলে সেটি দ্রুত ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যায়। এতে আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর চাপ কমে, ভিডিও আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক সংযোগে সমস্যা হলেও অনেক সময় স্থানীয় ওয়েবসাইট বা কাছাকাছি সার্ভারে রাখা কনটেন্ট স্বাভাবিকভাবে চলে। কিন্তু যে সেবার তথ্য বিদেশ থেকে আনতেই হবে, সেটি ধীর হয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রের নিচে ইন্টারনেটের মহাসড়ক
বিদেশের কোনো সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে তথ্যকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যেতে হয়। সেই যাত্রার প্রধান পথ সাবমেরিন কেবল। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৯৯ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক ডাটা সমুদ্রের নিচের টেলিযোগাযোগ কেবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ স্যাটেলাইট নয়, মহাদেশগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট যোগাযোগের বড় ভরসা এই কেবল।
সাবমেরিন কেবলের ভেতরে থাকে অপটিক্যাল ফাইবার ও একাধিক সুরক্ষা স্তর। ফাইবারে তথ্য বৈদ্যুতিক স্রোত হিসেবে নয়, আলোর সংকেত হয়ে ছুটে চলে। সমুদ্রতীরের ল্যান্ডিং স্টেশনে কেবলটি দেশের স্থলভাগের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর দেশীয় ফাইবার নেটওয়ার্ক ধরে তথ্য পৌঁছে যায় বিভিন্ন এলাকায়।
জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার সরঞ্জাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কারিগরি ত্রুটিতে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন বিকল্প পথে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকলে ইন্টারনেটের গতি কমে যায়। তাই নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের জন্য একাধিক কেবল ও বিকল্প পথ গুরুত্বপূর্ণ।
ফোনে তার নেই, নেটওয়ার্কে আছে
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় ফোনটি প্রথমে রেডিও তরঙ্গে কাছের বেস স্টেশন বা মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে তথ্য যায় অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কে। টাওয়ারকে মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রাখার এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ব্যাকহল।
ব্যাকহলে সাধারণত অপটিক্যাল ফাইবার বা মাইক্রোওয়েভ সংযোগ ব্যবহার করা হয়। অনেক টাওয়ারে মাটির নিচ দিয়ে ফাইবার পৌঁছেছে। আবার দুর্গম এলাকায় এক টাওয়ার থেকে অন্য টাওয়ারে মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গে তথ্য পাঠানো হয়। টাওয়ারের ওপরে থাকা গোলাকার ডিশগুলো প্রায়ই এই কাজ করে। অর্থাৎ মোবাইল ইন্টারনেটের শেষ অংশটি তারবিহীন হলেও পেছনের অবকাঠামো মোটেও পুরোপুরি তারবিহীন নয়।
চলন্ত বাস বা ট্রেনেও সংযোগ টিকে থাকে একই নেটওয়ার্ক কাঠামোর কারণে। প্রতিটি টাওয়ার একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘সেল’ সামলায়। ব্যবহারকারী এক সেল থেকে অন্য সেলে গেলে ফোনের সংযোগও দ্রুত নতুন টাওয়ারে চলে যায়। নেটওয়ার্ক ভালো থাকলে এই পরিবর্তন টের পাওয়া যায় না; দুর্বল সংকেত বা অতিরিক্ত চাপ থাকলে কল কেটে যেতে পারে কিংবা ভিডিও থেমে যায়।
স্যাটেলাইট কোথায় দরকার
পাহাড়, গভীর সমুদ্র কিংবা জনবসতি কম এমন এলাকায় ফাইবার বসানো বা মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ সব সময় সম্ভব নয়। সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প। স্টারলিংকের মতো নতুন ব্যবস্থা পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা অসংখ্য ছোট স্যাটেলাইট ব্যবহার করে, ফলে আগের অনেক স্যাটেলাইট সেবার তুলনায় যোগাযোগের বিলম্ব কম হয়।
তবে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের গতি আবহাওয়া, ব্যবহারকারীর অবস্থান, আকাশের দৃশ্যমানতা ও নেটওয়ার্কের চাপের ওপর নির্ভর করে। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও সব জায়গায় ভালো ফাইবার সংযোগের সমান অভিজ্ঞতা দেবে,এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইন্টারনেটের মালিক আসলে কে
ইন্টারনেটের একক কোনো মালিক নেই; তবে এর প্রতিটি অংশের মালিক আছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন কেবলে বিনিয়োগ করেছে, কেউ স্থলভাগে ফাইবার বসিয়েছে, কেউ মোবাইল টাওয়ার বা ডাটা সেন্টার চালায়। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব সার্ভার, ডাটা সেন্টার ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠান চুক্তি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে একে অন্যের নেটওয়ার্কে তথ্য পাঠায়। কোনো নেটওয়ার্ক অন্যটির কাছ থেকে ট্রানজিট সেবা কেনে, আবার দুটি নেটওয়ার্ক সরাসরি ট্রাফিক বিনিময়ও করে। দেশের ভেতরের নেটওয়ার্কগুলো স্থানীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জে সরাসরি যুক্ত হলে তথ্যকে অপ্রয়োজনে বিদেশ ঘুরে আসতে হয় না। এতে সময় ও খরচ,দুটিই কমে।
আপনার বিলের টাকা কোথায় যায়
বাসার ব্রডব্যান্ড বিল প্রথমে পায় স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা বা আইএসপি। মোবাইল ডাটার টাকা যায় সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাছে। কিন্তু গ্রাহকের দেওয়া পুরো অর্থই তাদের লাভ নয়। গ্রাহকের ঘর বা ফোন পর্যন্ত সংযোগ পৌঁছে দিতে কেবল, রাউটার, সুইচ, টাওয়ার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি লাগে। নেটওয়ার্ক সচল রাখতে বিদ্যুৎ, কর্মী, গ্রাহকসেবা, মেরামত ও নিরাপত্তার খরচ আছে। এর সঙ্গে দেশীয় ফাইবার অবকাঠামো, ডাটা পরিবহন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, ইন্টারনেট ট্রানজিট, ডাটা সেন্টার, কর, ভ্যাট ও নিয়ন্ত্রক ফিও যুক্ত হয়।
তবে আপনি ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখলেই বিলের নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ইউটিউব বা সাবমেরিন কেবলের মালিকের কাছে চলে যায় না। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট পরিমাণ নেটওয়ার্ক সক্ষমতা, সংযোগ বা অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য চুক্তি অনুযায়ী অর্থ দেয়। স্থানীয় ক্যাশ সার্ভার কিংবা দুটি নেটওয়ার্কের সরাসরি ট্রাফিক বিনিময় আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের খরচ কমাতে পারে। তাই গ্রাহকের বিল ভাগ হওয়ার কোনো একক সূত্র নেই; প্রতিষ্ঠান, এলাকা, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক চুক্তি অনুযায়ী হিসাব বদলায়। গ্রাহক আসলে ইন্টারনেটের কোনো অংশের মালিকানা কেনেন না। তিনি কেনেন নিজের ডিভাইসকে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কে যুক্ত রাখা এবং নির্ধারিত গতিতে তথ্য আদান-প্রদানের সেবা।
এক ক্লিকের পেছনে বিশাল আয়োজন
ফোনের পর্দায় একটি ভিডিও চালু করা আমাদের কাছে নিছক এক ক্লিকের ব্যাপার। অথচ সেই ক্লিকের উত্তর পৌঁছে দিতে একসঙ্গে কাজ করে সমুদ্রের তলদেশের কেবল, রাস্তার নিচের ফাইবার, মোবাইল টাওয়ার, রাউটার, সার্ভার, ডাটা সেন্টার এবং অসংখ্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান। ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই,এটি কোনো একক দরজা বা মালিকের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। হাজার হাজার আলাদা নেটওয়ার্ক একই নিয়মে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি পথ বন্ধ হলে অনেক ক্ষেত্রে অন্য পথে তথ্য পৌঁছাতে পারে। তাই ইন্টারনেটকে যতটা ‘বাতাসের প্রযুক্তি’ মনে হয়, বাস্তবে এটি তার, আলো, যন্ত্র আর পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যোগাযোগব্যবস্থাগুলোর একটি।
কেএসকে




