রাত ১২টা বাজার অপেক্ষায় থাকেন গৃহিণীরা
রাত বাড়ে। বাড়তে থাকে ক্লান্তি। অধিকাংশ ঘরে যখন ঘুম নেমে আসে, তখনও জেগে থাকেন রাজধানী ঢাকার অনেক গৃহিণী। তাদের চোখে ঘুম নেই। একটাই অপেক্ষা তাদের, ঘড়ির কাঁটা কখন ছোঁবে রাত ১২টা।
এই অপেক্ষা বিশেষ কোনো উপলক্ষের জন্য নয়, অপেক্ষা রান্নার গ্যাসের জন্য। যত ক্লান্তি, বেদনা, সমস্যা থাক না কেন বাঙালি বাড়িতে তো রান্না হওয়া চাই!
দিনভর চুলা জ্বলে। সন্ধ্যার পরেও জ্বলে না, এমন নয়। তবে তাতে রান্না হয় না। সামান্য চা করতেও কেটে যায় আধাঘণ্টা-একঘণ্টা। অগত্যা রাত গভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না। দিনের বেলায় পাইপলাইনে গ্যাস না থাকা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে ঢাকা শহরে। কখনো রাত ১১টা কখনো রাত ১২টায় গ্যাস আসে। আবার ভোর হতে না হতেই চলে যায়। এর মধ্যেই রান্নার কাজ সারতে হয় গৃহিণীদের।

গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানায় উৎপাদনে ধস
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহের এমন সংকট অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই বদলে দিয়েছে। রান্নার সময় এখন আর পরিবারের সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় গ্যাস কখন আসবে তার ওপর।
একজন গৃহিণীর দিনের হিসাব তাই পাল্টে গেছে। সকালে সন্তানদের স্কুল, স্বামীর অফিস, সংসারের অন্য কাজ- সব সামলে দুপুরে রান্না করতে গিয়ে চুলা জ্বলে না। বিকেলেও একই অবস্থা। সন্ধ্যায়ও গ্যাসের দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত রাত বাড়ার অপেক্ষা।
কোনো গ্রাহক যদি গ্যাস সরবরাহই না পান, তাহলে যে সেবা তিনি পাচ্ছেন না, তার জন্য তাকে অর্থ দিতে বাধ্য করা উচিত নয়। সংযোগ সচল রাখার জন্য একটি যৌক্তিক নির্দিষ্ট চার্জ থাকতে পারে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রাহকের কাছ থেকে গ্যাসের পুরো বিল নেওয়া উচিত নয়।-ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন
মিরপুরের এক গৃহিণী মাহমুদা আক্তার তার ভোগান্তির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আগে ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় রান্না করে নিতাম। এখন দিনের সব কাজ শেষ করেও রান্নার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। গ্যাসের চাপ রান্না করার মতো পর্যায়ে আসতে আসতে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা বেজে যায়। তখন রান্না শুরু করি। রান্না শেষ করতে করতে আরও রাত হয়, এরপর ঘুমাতে যাই।’
মাহমুদা বলেন, ‘গ্যাসের জন্য এভাবে প্রতিদিন রাত জাগা খুবই কষ্টকর ও বিব্রতকর। অন্য কাজেও ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারি না। হঠাৎ কোনো অতিথি এলে তাকে স্বাভাবিকভাবে আপ্যায়ন করারও সুযোগ থাকে না। একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপনই যেন গ্যাসের অনিশ্চয়তার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে।’
মাহমুদা অভিযোগ করে বলেন, ‘পুরোপুরি গ্যাস ব্যবহার করতে না পারলেও মাসে ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করতে হয়। এতে আবার বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যায়। আমার স্বামীর সীমিত আয়ে এই দুটি খরচ একসঙ্গে বহন করা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই গ্যাসের চাপ বাড়ার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করি।’
মাহমুদার মতো নগরীর হাজারো গৃহিণী গ্যাস সংকটের কারণে এমন সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক সময় তাদের মেজাজও খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। সহ্য ক্ষমতা কমছে। অল্প গ্যাসের চাপে মাঝেমধ্যে আধাঘণ্টার রান্না তিন-চার ঘণ্টাও লেগে যায়। কিন্তু এর কোনো সমাধানে যাচ্ছে না সরকার।
বিদ্যুতেও ভরসা নেই!
‘মাঝে মধ্যে এমন হয় যে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি গ্যাস নেই। রান্না শুরু করি ইন্ডাকশনে। তরকারি আধাসিদ্ধ অবস্থায় বিদ্যুৎও চলে যায়। অনেকসময় রান্নাটাই নষ্ট হয়ে যায়। কোনো উপায় থাকে না ফেলে দেওয়া ছাড়া।’ বলছিলেন রাজধানীর আরেক গৃহিণী শাহানাজ।
তিনি বলেন, ‘আবার এমন হয় যে রান্না শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে যায়, তরকারি প্লেটে নিয়ে খাওয়ার সময় দেখা যায়। কিছু সিদ্ধ হয়েছে, কিছু হয়নি। গ্যাস সংকটের কারণে রান্নার খরচও বেড়েছে অনেক। রান্নায় ঝামেলার পাশাপাশি খরচও বেড়েছে।’
যারা বাড়তি খরচ করে রান্নার জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, এমন পরিবারগুলোরও ভোগান্তি কমছে না। রান্নার মাঝপথে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক সময় বিপাকে পড়তে হচ্ছে। আগে থেকে কোনো ঘোষণা না থাকায় রান্না শুরুর পর বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজ থেমে যাচ্ছে।
আমরা বিল পাই ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের, এখন আমরা সাপ্লাই দিতে পারছি ১২০ মিলিয়নের কাছাকাছি। পেট্রোবাংলা আমাদের জানিয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০-২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। তখন সংকট কিছুটা কাটতে পারে।-তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান
কুড়িল এলাকার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার স্ত্রী রান্না শুরু করার কয়েক মিনিট পরই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। রান্না মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তরকারিটি ঠিকমতো সিদ্ধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত পুরো রান্নাটিই ফেলে দিতে হয়েছে।’
গ্যাসের সংকটের কারণে এমনিতেই বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি হচ্ছে। তার ওপর বিকল্প হিসেবে বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেও যদি রান্নার মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। সংশ্লিষ্টদের উচিত দ্রুত সমস্যার সমাধান করা, জানান আমিরুল।
গ্যাস ব্যবহার কম করেও পূর্ণ বিল, বিদ্যুৎ খরচও বাড়তি
গ্যাসের সরবরাহ ঠিকঠাক না পেলেও নির্ধারিত মাসিক বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। আবার রান্না চালিয়ে নিতে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ কিংবা এলপিজি। ফলে একই রান্নার জন্য একদিকে গ্যাসের বিল, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বা এলপিজির খরচ- দুই দিকের ব্যয়ই বহন করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। বাড়তি এই খরচ জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে থাকা নগরবাসীর জন্য যেন দ্বিগুণ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী বেলাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জুন মাসে প্রিপেইড মিটারে খরচ ছিল এক হাজার ৬৭২ টাকা। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২৯৬ টাকায়। রান্নার কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করায় এই অতিরিক্ত খরচ।’ অর্থাৎ ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে তার ব্যয়।
গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করায় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে বিল
বেলাল বলেন, ‘আমার পোস্টপেইড গ্যাসের লাইন। গ্যাস প্রয়োজনের সময় থাকে না বললেই চলে। অথচ প্রতি মাসে দুই বার্নারের জন্য এক হাজার ৮০ টাকা নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।’
তার মতে, একদিকে রান্নার জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, অন্যদিকে গ্যাস ব্যবহার কম করেও নির্ধারিত বিল দিতে হচ্ছে। কখনো কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। অর্থাৎ, একই রান্নার জন্য তাকে কার্যত তিন ধরনের জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
পাশাপাশি ইন্ডাকশন কুকার ও অন্য উপযোগী রান্নার সরঞ্জাম কিনতেও প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে বলে জানান বেলাল।
‘গ্যাসের পুরো বিল নেওয়া উচিত নয়’
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘কোনো গ্রাহক যদি গ্যাস সরবরাহই না পান, তাহলে যে সেবা তিনি পাচ্ছেন না, তার জন্য তাকে অর্থ দিতে বাধ্য করা উচিত নয়। সংযোগ সচল রাখার জন্য একটি যৌক্তিক নির্দিষ্ট চার্জ থাকতে পারে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রাহকের কাছ থেকে গ্যাসের পুরো বিল নেওয়া উচিত নয়।’

বাড়তি আমদানিতেও সিলিন্ডার গ্যাসে সংকট
সেবা না দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা ভোক্তা অধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংকট কাটাতে করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ বাড়িয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নগর পরিবারের জ্বালানি চাহিদা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এ কার্যক্রমে আমাদের দুর্বলতা আছে। এজন্য আমরা সংকটের মধ্যে পড়ি। আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও কাজে থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে এই কাজগুলো করতে পারলে সংকট কাটবে।-জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮২৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার ৩শ এমএমসিএফডির মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দৈনিক ঘাটতি থাকছে প্রায় ১৫শ এমএমসিএফডি।

তবে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ প্রতিদিন ওঠা-নামা করে। সাম্প্রতিক হিসাবে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ ছিল প্রায় দুই হাজার ৩২৮ এমএমসিএফডি।
পেট্রোবাংলার চাহিদা পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের সবচেয়ে বেশি চাহিদা বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৪১৫ এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এরপর শিল্পখাতে চাহিদা প্রায় ৯৮৯ এমএমসিএফডি ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৭৪৩ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ, শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ার- এই তিন খাতেই মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৮২ শতাংশ প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া আবাসিক খাতে প্রতিদিন প্রায় ২৯০ এমএমসিএফডি, সার কারখানায় ২৩০ এমএমসিএফডি এবং সিএনজি খাতে প্রায় ১৩০ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বাণিজ্যিক ও চা-বাগান খাতে চাহিদা প্রায় ২৮ এমএমসিএফডি। সব মিলিয়ে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮২৫ এমএমসিএফডি।
আবাসিকে গ্যাস সংকট নিয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকায় প্রচুর অবৈধ সংযোগ আছে। এজন্য প্রকৃত ডিমান্ড বলা যাচ্ছে না। আমরা বিল পাই ১৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের, এখন আমরা সাপ্লাই দিতে পারছি ১২০ মিলিয়নের কাছাকাছি।’
তিনি বলেন, ‘পেট্রোবাংলা আমাদের জানিয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০-২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। তখন সংকট কিছুটা কাটতে পারে।’
কথা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক অধ্যাপক, ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট আজকের সমস্যা নয়, এটা বহু পুরোনো। এই সমস্যা সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ কার্যক্রমে আমাদের দুর্বলতা আছে। এজন্য আমরা সংকটের মধ্যে পড়ি। আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও কাজে থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে এই কাজগুলো করতে পারলে সংকট কাটবে।’
আইএইচও/এএসএ/এমএফএ



