ব্লু-জুয়েলের পর্দার দুঃসাহসিক অভিযান যেন বাস্তবে তাদের ফেরার গল্প
অ্যানিমেটেড সিনেমা রিও-এর কথা মনে আছে? নীল রঙের দুই ম্যাকাও পাখি ব্লু ও জুয়েলের প্রেম, দুঃসাহসিক অভিযান আর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল সিনেমার গল্প। ২০১১ সালে প্রথম এবং ২০১৪ সালে এর দ্বিতীয় সিক্যুয়াল তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সিনেমার সেই নীল পাখি কোনো কাল্পনিক প্রজাতি নয়। ব্লু ও জুয়েল যে প্রজাতির পাখি, তার নাম স্পিক্স ম্যাকাও, বৈজ্ঞানিক নাম সায়ানোপসিটা স্পিক্সি। আর বাস্তবের এই পাখির গল্প সিনেমার চেয়েও চমকপ্রদ কারণ একসময় বন্য পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া এই পাখিকে এখন আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সিনেমাটি মূলত এই বিলুপ্তপ্রায় পাখিটি সংরক্ষণের সচেতনটা বাড়াতেই তৈরি হয়েছিল।
নীল রঙের জন্যই এই পাখি আকর্ষণীয়
স্পিক্স ম্যাকাও তোতা পরিবারের মাঝারি আকারের একটি পাখি। শরীরজুড়ে নীল রঙের বিভিন্ন শেড, ধূসরাভ মাথা এবং উজ্জ্বল নীল ডানা সব মিলিয়ে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি সায়ানোপসিটা গণের একমাত্র প্রজাতি। এই পাখির নাম এসেছে জার্মান প্রকৃতিবিদ জোহান ব্যাপটিস্ট ভন স্পিক্স-এর নাম থেকে। অন্য অনেক বড় ম্যাকাওয়ের তুলনায় স্পিক্স ম্যাকাও আকারে কিছুটা ছোট।
স্পিক্স ম্যাকাওয়ের প্রাকৃতিক আবাস ছিল ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাতিঙ্গা অঞ্চলে। কাতিঙ্গা মূলত শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক বনভূমির একটি বিশেষ পরিবেশ। পাখিটি বিশেষভাবে মৌসুমি জলধারার পাশের নদীতীরবর্তী বন বা নদী তীরবর্তী গ্যালারি বন-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই আবাসস্থলের নির্দিষ্ট কিছু গাছ তাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাসা বাঁধা, আশ্রয় নেওয়া এবং খাবার সংগ্রহ সবকিছুর সঙ্গেই স্থানীয় উদ্ভিদ ও গাছপালার সম্পর্ক ছিল।
স্পিক্স ম্যাকাওয়ের খাবার ও স্বভাব
স্পিক্স ম্যাকাওয়ের বন্য জীবনের বিষয়ে তথ্য খুব বেশি নেই। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পাখিটির সংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে বনে তাদের স্বাভাবিক আচরণ পর্যবেক্ষণের সুযোগও সীমিত ছিল। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এরা বিভিন্ন বীজ, ফল ও উদ্ভিদের অংশ খেত। নিডোস্কোলাস কোয়েরসিফোলিয়াস গাছের বীজ এবং জ্যাট্রোফা মলিসিমা-এর ফল তাদের খাদ্যতালিকার মধ্যে ছিল। বন্য অবস্থায় ছোট দলে চলাফেরারও তথ্য পাওয়া যায়। সাধারণত গাছের প্রাকৃতিক গর্তে বাসা বাঁধত এবং বর্ষাকালকে ঘিরে প্রজনন করত।
কেন হারিয়ে গেল?
স্পিক্স ম্যাকাওয়ের বিপর্যয়ের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা রেখেছে। তাদের সীমিত প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবর্তনের ফলে পাখিটির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ক্রমেই কমে যায়। এর পাশাপাশি বন্য পাখি ধরে অবৈধ বাণিজ্যও তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
কাতিঙ্গার নির্দিষ্ট একটি আবাসস্থলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় পরিবেশের পরিবর্তন তাদের জন্য আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফলে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বন্য স্পিক্স ম্যাকাওয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

২০১৯ সালে ‘বিলুপ্ত’ ঘোষণা, কিন্তু পুরোপুরি নয়
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। স্পিক্স ম্যাকাওকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়নি। ২০১৯ সালে আইইউসিএন প্রজাতিটিকে ‘এক্সটিক্ট ইন দ্য ওয়াইল্ড’ বা ‘বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। অর্থাৎ বনে এদের আর কোনো স্বাভাবিক জনগোষ্ঠী ছিল না, কিন্তু মানুষের তত্ত্বাবধানে বন্দি অবস্থায় কিছু পাখি তখনো বেঁচে ছিল।
বন্য পরিবেশে শেষ নিশ্চিত পাখিটির দেখা ২০০০ সালের দিকে পাওয়া যায়। পরে বিভিন্ন সময়ে দেখার দাবি উঠলেও সেগুলোর সবকটি নিশ্চিত বন্য পাখি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই স্পিক্স ম্যাকাওয়ের জন্য তখন একমাত্র আশার জায়গা ছিল বন্দি অবস্থায় থাকা পাখিগুলোকে প্রজননের মাধ্যমে বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে তাদের আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া।
২০২২ সালে শুরু হলো নতুন অধ্যায়
দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ ও কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির পর অবশেষে আসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০২২ সালে ব্রাজিলের বাহিয়া অঞ্চলে স্পিক্স ম্যাকাওকে আবার বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করা শুরু হয়। দুই দফায় মোট ২০টি বন্দি অবস্থায় জন্ম নেওয়া স্পিক্স ম্যাকাওকে প্রকৃতিতে ছাড়া হয়। তাদের সঙ্গে ১৫টি ব্লু-উইংড ম্যাকাওও ছিল। অবমুক্তির পর পাখিগুলোর গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
শুধু পাখি ছেড়ে দিলেই অবশ্য কাজ শেষ হয়ে যায় না। নতুন পরিবেশে তারা খাবার খুঁজে পাচ্ছে কি না, অন্য পাখির সঙ্গে মিশতে পারছে কি না, বাসা বানাতে পারছে কি না সবকিছুই নজরদারির মধ্যে রাখা হয়।
বনে জন্ম নিল নতুন প্রজন্ম
সবচেয়ে আশার খবর আসে ২০২৩ সালে। পুনঃঅবমুক্ত করা পাখিদের মধ্যে একটি জোড়া কৃত্রিম বাসা বা নেস্ট ক্যাভিটিতে ডিম দেয় এবং সফলভাবে ছানা ফোটায়। গবেষকদের নথি অনুযায়ী, এটি ছিল তিন দশকেরও বেশি সময় পর বন্য পরিবেশে স্পিক্স ম্যাকাওয়ের ছানা ফোটার ঘটনা। এমনকি একটি ছানা সফলভাবে বাসা থেকে উড়েও যায়। অর্থাৎ রিও সিনেমার ব্লু ও জুয়েল কাল্পনিক চরিত্র হলেও তাদের প্রজাতির বাস্তব গল্প যেন সিনেমার গল্পকেই ছুঁয়ে যায়।
একসময় মানুষের কর্মকাণ্ডে যে পাখি বন্য পরিবেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পাখিকেই আবার তার পুরোনো আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এটিকে এখনো সম্পূর্ণ সাফল্য বলা যাবে না। একটি স্থায়ী ও স্বনির্ভর বন্য জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে আরও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ, প্রজনন এবং আবাসস্থল রক্ষার প্রয়োজন। স্পিক্স ম্যাকাওয়ের গল্প তাই শুধু একটি বিরল পাখির গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে বিলুপ্তির বিপদ, প্রকৃতি ধ্বংসের পরিণতি এবং মানুষের উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার আশার গল্প।
সূত্র: সেফ ওয়ার্ল্ড ওয়াইড, পাইরি দাইজ, টাইমস অব ইন্ডিয়া
কেএসকে


