কৃষকের সার গুদামে আছে, মাঠে নেই
রাজশাহীতে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত থাকার পরও প্রয়োজনের সময়ে তা পাচ্ছেন না কৃষক। সারের জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। কোথাও কোথাও সার না পেয়ে কৃষকদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে সরকারি হিসাব বলছে, রাজশাহীতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কোনো কোনো সারের মজুত চলতি মাসের বরাদ্দের কয়েকগুণ বেশি। বিভাগীয় প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও বলছে, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে বলা হচ্ছে সার শেষ। আবার একই এলাকায় বেশি দামে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
‘ইউরিয়া সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আশা করছি, এ নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। সার বরাদ্দ দেওয়া ও উত্তোলনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে সার পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। বর্তমানে জেলার মজুত পরিস্থিতিও আমরা পর্যালোচনা করেছি। এতে দেখা গেছে, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই এবং সংকটের কোনো সম্ভাবনাও নেই।’
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে-সরকারি গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, বরাদ্দও যদি কৃষকের চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে প্রয়োজনের সময়ে সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন? সরকারি বরাদ্দের সার যাচ্ছে কোথায়?
সম্প্রতি রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও পুঠিয়ায় ডিলারের গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুত এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে প্রশাসনের অভিযান এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
পুঠিয়ায় সারের জন্য মহাসড়ক অবরোধ
সম্প্রতি রাজশাহীর পুঠিয়ায় সারের জন্য মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কৃষকদের ভাষ্য মতে, সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধানের ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাজারে সার থাকার পরও ডিলারের দোকানে না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
‘সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে এবং তাঁরা দোকানে বিক্রি করছেন।’
এরই মধ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শীলমাড়িয়া ইউনিয়নের কার্তিকপাড়া বাজারে অভিযান চালিয়ে অননুমোদিতভাবে মজুত করা ৩৩০ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং রাতের আঁধারে সার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কৃষকের চাহিদার সময়ে বাজারে সার না থাকলেও কীভাবে বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সার মজুত থাকছে। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের সার ডিলার পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তার সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিক্রির ওপর নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গোদাগাড়ীতে ডিলারের গুদামে ৮১৭ বস্তা
পুঠিয়ার ঘটনার আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতেও এক সার ডিলারের গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত দুই দফা অভিযান চালিয়ে গোদাগাড়ী সদর এলাকার ডাইংপাড়ায় মেসার্স কৃষি ঘরের গুদাম থেকে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা হয় ৮১৭ বস্তা সার।
অভিযোগ ছিল, কৃষকদের চাহিদার সময়ে সার বিক্রি না করে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত করে রাখা হয়েছিল। অভিযানের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত সার ডিলার সোলাইমান পাটোয়ারীকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
‘তিন দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাইনি। অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।’
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোলাইমান পাটোয়ারী বিসিআইসি ও বিএডিসির সার ডিলার। সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে গত দুই মাসে তাকে তিনবার সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও নিয়ম না মেনে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান ও তদারকি করা হচ্ছে। কেউ অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা কৃষকদের হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গুদামে হাজার হাজার টন সার
নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির সার গুদাম পরিদর্শন শেষে ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী জানান, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই।
তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। অন্যদিকে বিএডিসির গুদামে রয়েছে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি ও ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি।
চলতি মাসের বরাদ্দের সঙ্গে মজুতের তুলনা করলেও সারের পর্যাপ্ততা স্পষ্ট হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন। বিভাগীয় কমিশনারের তথ্যমতে, চলতি মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন। এর বিপরীতে শুধু বিএডিসির গুদামেই রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন টিএসপি।
অন্যদিকে ইউরিয়ার মাসিক বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০০ টন। এর বিপরীতে বিসিআইসির বাফার গুদামেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন ইউরিয়া।
অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ের মজুত বিবেচনায় রাজশাহীতে সারের ঘাটতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কয়েকটি ক্ষেত্রে মজুত চলতি মাসের বরাদ্দের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তাহলে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন?
সরকারি গুদামের মজুত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এই বৈপরীত্যই এখন রাজশাহীর সারের বাজার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঝলমলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল বলেন, তিন দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাইনি। অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক নরেন কর্মকারের অভিযোগ, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাইনি। ধানের জমিতে এখন সার না দিলে ফলন কমে যাবে। গুদামে যদি সার থাকে, তাহলে আমাদের কাছে আসে না কেন?
আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ১০টার দিকে বলা হয় সার শেষ। আমাদের প্রশ্ন-সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে।

কৃষকদের এসব অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিলারদের গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুত থাকার ঘটনা। ফলে শুধু সরকারি গুদামের মজুতের হিসাব নয়, গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় ডিলারের দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু একই এলাকার অন্য দোকান বা খুচরা বাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে সরকারি বরাদ্দের সার কীভাবে খুচরা বাজারে যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার না পেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে আমন মৌসুমে সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সার সরবরাহ ব্যবস্থার সামান্য অনিয়মও কৃষকের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি গুদামে কত টন সার রয়েছে, সেই হিসাব দিয়ে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। গুদাম থেকে ডিলার পর্যন্ত সরবরাহ, ডিলারের উত্তোলন, গুদামে মজুত, দোকানে বিক্রি এবং কৃষকের কাছে বিক্রির হিসাব একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
তাদের মতে, কোন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কতটুকু উত্তোলন করেছেন, কতটুকু বিক্রি করেছেন, কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে এবং কার কাছে কত সার বিক্রি হয়েছে-এসব তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কৃষকরা সার না পেয়ে বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধ করেছেন, সেসব এলাকার বরাদ্দ ও সরবরাহের হিসাবও আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
সারসংকট নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী বলেন, সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে এবং তাঁরা দোকানে বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, বাইরে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গুদামে সারের মজুত সবার সামনেই দৃশ্যমান। এখানে লুকানোর কিছু নেই।
তিনি আরও বলেন, ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের যতটুকু সার প্রয়োজন, সরকারের কাছে তার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই সার নিয়ে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে এবং আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার বলেন, ইউরিয়া সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আশা করছি, এ নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। সার বরাদ্দ দেওয়া ও উত্তোলনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে সার পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। বর্তমানে জেলার মজুত পরিস্থিতিও আমরা পর্যালোচনা করেছি। এতে দেখা গেছে, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই এবং সংকটের কোনো সম্ভাবনাও নেই।
এনএইচআর/এএসএম





