পর্যটক-দর্শনার্থী কমছে শালবন বিহারে, কারণ কী
অষ্টম শতকের অনন্য কীর্তি কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর হারাতে বসেছে তার পুরোনো জৌলুশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রচারণার অভাব আর অবকাঠামোগত নানা সংকটে কমছে পর্যটক-দর্শনার্থী। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়ে। প্রতিবছর রাজস্ব আয়ও কমছে।
শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরের সূত্রমতে, ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দলভিত্তিক ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে দর্শনার্থী বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল চার লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৮ জন। তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আয় হয় এক কোটি ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৮২১ টাকা। তবে পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দর্শনার্থী কমেছে ২২ হাজার ৭৬২ জন। এসময় দর্শনার্থী এসেছে চার লাখ ৪৫ হাজার ৫৯৬ জন। ওই অর্থবছরে ১১ লাখ ৯৬ হাজার ২০৪ টাকা রাজস্ব কমে আয় হয় এক কোটি ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ টাকা।
‘আমাদের দেশে হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে শালবন বৌদ্ধ বিহার অন্যতম। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা উচিত। এতে বিদেশি পর্যটকের আগমন ও রাজস্ব দুটোই বাড়বে। আমার মনে হয়েছে, পর্যটন করপোরেশন ও পর্যটন বোর্ড থেকে প্রচার-প্রচারণায় ভাটার কারণে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম’
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়ছে চার লাখ ৩ হাজার ২৭২ জনে। রাজস্ব আয় হয়েছে এক কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৭ টাকা। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে কমছে দর্শনার্থীর সংখ্যা ও রাজস্ব আয়।

সরেজমিন শালবন বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। বিভিন্ন রঙের ফুল, পাতাবাহার ও রঙ্গন গাছ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে বৌদ্ধ বিহারে আঙিনায়। ফুল বাগানের পরিচর্যা করছেন মালিরা। দর্শনার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। বিহারের পশ্চিম পাশে দর্শনার্থীদের বসার বেঞ্চগুলো এবং সিমেন্টের ঢালাই করা পথের অবস্থা বেহাল।
স্ত্রীকে নিয়ে কুমিল্লার বরুড়া থেকে ঘুরতে এসেছেন নাহিদ হাসান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শালবন বৌদ্ধ বিহারে একাধিকবার এসেছি। এর সৌন্দর্য বারবার আমাদের মুগ্ধ করে। তবে কোটবাড়িতে আগের মতো এখন জৌলুশ নেই। তাছাড়া একটা কমন সমস্যা হলো আশপাশে ভালো মানের খাবারের দোকান নেই। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও পর্যটন বোর্ড এদিকে নজর দিলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করি।’
ঢাকা থেকে প্রথমবারের মতো পুরাকীর্তি শালবন বৌদ্ধ বিহার ঘুরতে এসেছেন সাইফুল ইসলাম ও তার তিন বন্ধু। সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানতে হলে এ ধরনের স্থানে ভ্রমণ করা প্রত্যেক মানুষের উচিত। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম দিনের শিক্ষা সফর এসব স্থানে হলে শিক্ষার্থীরা সচিত্র ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে সহজেই জানতে পারবে।’

কলেজশিক্ষক মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘আমাদের দেশে হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে শালবন বৌদ্ধ বিহার অন্যতম। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা উচিত। এতে বিদেশি পর্যটকের আগমন ও রাজস্ব দুটোই বাড়বে। আমার মনে হয়েছে, পর্যটন করপোরেশন ও পর্যটন বোর্ড থেকে প্রচার-প্রচারণায় ভাটার কারণে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম।’
কথা হয় কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবিরের সঙ্গে। তিনি জানান, কুমিল্লার কোটবাড়ি সভ্যতা প্রায় ১২শ বছর আগের। মূলত সমতট অঞ্চল এই সভ্যতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে।
আহসানুল কবির বলেন, ‘এই সভ্যতাকে ধরে রাখার জন্য এবং পর্যটনকেন্দ্র ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সরকারের যতটুকু আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন, আমরা নিকট অতীতে কারও মধ্যে সেই আন্তরিকতা দেখিনি। সমন্বিত পরিকল্পনা করে পাঁচতারকা মানের হোটেলসহ ভালো মানের কিছু হোটেল করা যেতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব উদ্যোগেও মোটেল করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ দ্রুত করতে কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় ওভারপাস বা আন্ডারপাস করা খুবই প্রযোজন। কারণ এই স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাছাড়া মহাসড়ক পাড়ি দিতে দীর্ঘসময় অপেক্ষাও করতে হয়। এতে মানুষে গুরুত্বপূর্ণ সময়ও নষ্ট হচ্ছে।’
সন্ধ্যার পর কোটবাড়ি এলাকায় পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন জানিয়ে এই ইতিহাস গবেষক বলেন, ‘পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিসহ আরও নজরদারি জোরদার করা উচিত।’
পর্যাটকদের কাছে শালবন বিহার ও জাদুঘরের গুরুত্ব বাড়াতে বুকলেট, পুস্তিকা, বিলবোর্ড এবং ডিজিটাল প্রচার বাড়ানোর প্রযোজন বলে মনে করেন এই গবেষক।

এ বিষয়ে শালবন বৌদ্ধ বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. শাহীন আলম বলেন, ‘২০২৪ সালের পর থেকে দর্শনার্থীর সংখ্যা ও রাজস্ব আয় কমেছে। তবে দর্শনার্থী ও রাজস্ব আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ময়নামতি জাদুঘরের পাশে একটি শিশু কর্নার স্থাপন করা হচ্ছে। গাড়ি রাখার মাঠের উত্তর পাশে ফুডকোর্ট এবং পশ্চিম পাশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য মিলনায়তন স্থাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে আশা করছি রাজস্ব আয় বাড়বে।’
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে জাদুঘরের কাস্টডিয়ান বলেন, সিসিটিভির মাধ্যমেও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়। এখন আগের মতো হকার ও ক্যামেরাম্যানদের উৎপাত নেই। পর্যটন পুলিশ, আনসার ও সিভিল টিমের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
জেডআইপি/এসআর/এএসএম





