খালাস পাওয়া ১০ আসামির নথি কারাগারে, মুক্তি পেলেন দুজন
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টে খালাস পাওয়া ১০ আসামির মধ্যে দুজন কারামুক্ত হয়েছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কারাগার থেকে মুক্তি পান সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন এবং সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ।
ফেনী জেলা কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন মাকুসদ। আর রুহুল আমিন মুক্তি লাভ করেন চট্টগ্রাম কারাগার থেকে। দুটি কারাগারের জেল সুপাররা মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অন্য আট আসামিরও মুক্তির নথি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছেছে বলে জানান স্বজনরা। তবে প্রক্রিয়া শেষ করতে বিলম্ব হওয়ায় মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরের আগে তাদের মুক্তি মিলছে না।

নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
কাশিমপুর কারাগারে মুক্তির অপেক্ষায় আছেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আবদুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা ও আবছার উদ্দিন।
এ বিষয়ে নুসরাত হত্যা মামলার বাদী ও তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আসামিরা জামিনে মুক্তি পাওয়ায় তাদের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হযেছে। প্রশাসন নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবে বলে আশা করি।
এর আগে, ২৪ আগস্ট মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে অপর চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়।
মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের ও উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

আলোচিত এ মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দিয়েছিলেন। রায়ে মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর গত ২৮ জুলাই হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। ২০ আগস্ট শুনানি গ্রহণ শেষে আদালত রায়ের জন্য ২৪ আগস্ট তারিখ ধার্য করেন।
ওইদিন নিম্ন আদালতের রায়ের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। এ মামলায় নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশিদ, তার বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অনেকটা ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’। অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি তার মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিসিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কতটুকু মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, তা আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।
অগ্নিসন্ত্রাসের এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এসআর/এএসএম



