প্রশিক্ষণের পর নারীদের কর্মসংস্থানের পথও দেখাতে হবে
নারীদের শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশিক্ষণের পর অর্জিত দক্ষতা কোথায় ও কীভাবে কাজে লাগিয়ে তারা আয় করতে পারবেন, সেই পথও দেখাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেন, বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে প্রশিক্ষণ দিলে সরকারি অর্থ ও প্রশিক্ষণার্থীদের সময় ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রশিক্ষণের আগে সংশ্লিষ্ট খাতের চাহিদা, কাজের সুযোগ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা ও গবেষণা প্রয়োজন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘জীবিকায়নের জন্য মহিলাদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’র প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, আমার দায়িত্ব শুধু ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া-এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে এসব নারী কোথায় কাজ করবেন এবং কীভাবে দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করবেন, সেই পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণে স্থানীয় বাজারের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও কাজের সুযোগ এক নয়। তাই সব এলাকায় একই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যকর নাও হতে পারে। কোন এলাকায় কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, তা যাচাই করেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজাতে হবে।
এক্ষেত্রে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও সহযোগী বেসরকারি সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে একজন নারী যদি অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ না পান, তাহলে প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে বলেও মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ গ্রহণই শেষ কথা নয়। অর্জিত দক্ষতার নিয়মিত চর্চা করতে হবে। পাশাপাশি বাজার ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষের চাহিদার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। একজন উদ্যোক্তা যে পণ্য তৈরি করবেন, তাতে তার সময়, শ্রম ও বিনিয়োগ রয়েছে। তাই সেই পণ্যের বাজারে চাহিদা আছে কি না, সেটিও ভাবতে হবে। প্রতিদিন নিজের দক্ষতা কতটা বাড়ালেন এবং নতুন কী শিখলেন, সে বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের নিজেদের দক্ষতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের আয় শুরু করলে সেটি তার ব্যক্তিগত সফলতা। কিন্তু সেই দক্ষতার মাধ্যমে আশপাশের আরও কয়েকজন নারী উপকৃত হলে তখন এর সামাজিক সার্থকতা তৈরি হয়।
সেলাই মেশিন পাওয়া নারীদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, আপনার হাতে সেলাই মেশিন পৌঁছালেই কর্মসূচি সফল হবে না। আপনার কাছ থেকে আরও ১০ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে পারলে তখনই এ উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে সফল হবে।
শুধু সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের কর্মক্ষম সময় সীমিত। তাই সুযোগ ও সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ শুধু সরকার বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।
বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের বড় শক্তি উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হবে। নারীদের ক্ষেত্রেও কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো, তার চেয়ে প্রশিক্ষণের পর কতজন স্বাবলম্বী হলেন সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নকারী এনজিওগুলোকে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ এবং সেই চাহিদা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানাতে বলেন।
অনুষ্ঠানে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলা প্রশাসক প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতার পরিধি আরও বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে নিয়মিত জানার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আজকের প্রশিক্ষণই শেষ নয়। অর্জিত দক্ষতাকে আরও প্রসারিত ও উন্নত করতে হবে। পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীদেরও এগিয়ে যেতে হবে।
এমআরএএইচ/এএমএ



