গুদামে সর্বোচ্চ মজুতের পরও ‘চাপে পড়ে’ চাল কিনছে সরকার

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমের ধান ও চাল সংগ্রহ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তারপরেও নতুন করে অভ্যন্তরীণ মিলগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিল মালিক ও রাজনৈত...

দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমের ধান ও চাল সংগ্রহ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তারপরেও নতুন করে অভ্যন্তরীণ মিলগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মিল মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জোরালো চাপে এই বাড়তি চাল কেনা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা না বাড়িয়ে শুধু চাল কেনায় সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা।

কারণ, সরকারের সংগ্রহের নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান এবং মিলারদের কাছ থেকে প্রক্রিয়াজাত চাল কেনে। ফলে নতুন করে শুধু চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ায় এর পুরো সুফল যাচ্ছে বাণিজ্যিক মিলারদের পকেটে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার মোট ১৮ লাখ ৯৪ হাজার টন ধান ও চাল সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ধানের পরিমাণ ৫ লাখ ৭৮ হাজার টন, সিদ্ধ চাল ১২ লাখ ১১ হাজার টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার টন, যা প্রাথমিক লক্ষ্যের চেয়েও বেশি। মৌসুমের শুরুতে সরকার ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল।

সংগ্রহের মূল মৌসুমে যে মিল মালিক এক হাজার টন চাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ছয় টন, সে-ও এখন এমপিদের ডিও লেটার নিয়ে এসে পাঁচ হাজার টনের বরাদ্দ চাইছে।—খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা

এ অবস্থায় সরকারের কাছে ধান ও চালের মজুত দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ২৩ হাজার ২৯৩ টন। যেখানে গম ও আতপ চালসহ মোট খাদ্যশস্যের বর্তমান মজুত ২৩ লাখ ৩৯ হাজার টন, যা অন্য যে কোনো বছরের একই সময়ের সর্বোচ্চ। এছাড়া দীর্ঘ কয়েক বছর পরে বোরো মৌসুমে এত পরিমাণে ধান-চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে সরকার।

সূত্র বলছে, বর্তমানে মজুত ও সংগ্রহ সর্বোচ্চ হওয়ার কারণে দেশের অনেক খাদ্যগুদামে ধান-চাল রাখার জায়গা নেই। সংগ্রহের জন্য পাটের বস্তার ব্যাপক সংকট চলছে। তারপরও চাল কেনার সিদ্ধান্ত শুধু মিলারদের তোড়জোড়ের কারণে।

সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের সর্বোচ্চ মজুত থাকা সত্ত্বেও নতুন করে প্রায় দুই লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে মিল মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জোরালো চাপ। নতুন করে চাল সরবরাহের বরাদ্দ পেতে খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চলছে ব্যাপক তদবির।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নতুন বরাদ্দের জন্য এরই মধ্যে সারাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে আটশ মিল মালিকের আবেদন জমা পড়েছে। চালের বরাদ্দ পেতে দেড় শতাধিক মিল মালিক নিজ নিজ এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) জমা দিয়েছেন। শুধু চিঠি দিয়েই ক্ষান্ত হননি অনেকে; তাদের কেউ কেউ এমপিদের নিয়ে সরাসরি অধিদপ্তরে এসেছেন এবং ফোনে ধারাবাহিকভাবে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি খাদ্য মন্ত্রণালয়ও। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিদিন নানামুখী সুপারিশ আসছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

এবার ধানের দাম কম ছিল, যে কারণে সরকারকে চাল সরবরাহ করে মিলাররা লাভবান হয়েছেন। সেজন্যেই আগ্রহ বেশি এবার।—জামাল হোসেন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংগ্রহের মূল মৌসুমে যে মিল মালিক এক হাজার টন চাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ছয় টন, সে-ও এখন এমপিদের ডিও লেটার নিয়ে এসে পাঁচ হাজার টনের বরাদ্দ চাইছে। সুপারিশ আর চাপের শেষ নেই।’

খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে, সেখানে মিল মালিক ও এমপিদের এ ধরনের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক চাপে নতুন করে চাল বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া সরকারের স্বাভাবিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, মিলারদের চাল বরাদ্দের জন্য বিভিন্ন তরফ থেকেই সুপারিশ এসেছে—এটা সত্য। সেগুলো মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের জন্য বলেছে। এরই মধ্যে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১ লাখ ১৫ হাজার টনের বরাদ্দ তালিকা হয়েছে।

তিনি বলেন, এবার ধানের দাম কম ছিল, যে কারণে সরকারকে চাল সরবরাহ করে মিলাররা লাভবান হয়েছেন। সেজন্যেই আগ্রহ বেশি এবার।

সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে এ কর্মকর্তা বলেন, নতুন সরকারও চায় খাদ্যনিরাপত্তা মজুত বাড়াতে, যেন সাধারণ মানুষ স্বস্তিদায়ক দামে খাদ্যশস্য কিনতে পারে।

মিল মালিকরা বোরোতে এত আগ্রহী হলে সামনে আমন মৌসুমে ধানের দাম কমে যাবে। এতেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রয়োজনে সরকারের আমন মৌসুমে ধান সংগ্রহ বাড়ানো উচিত।—ড. জাহাঙ্গীর আলম খান

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত এ বছর বাজারে ধানের দাম কম থাকায় চাল সরবরাহ করে লাভবান হয়েছেন মিল মালিকররা। সরকার এবার সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে ক্রয় করেছে। যা পাইকারি বাজারের চেয়েও বেশি। চাল সরবরাহ করে মিল মালিকরা প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত মুনাফা পেয়েছেন।

তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তায় পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও কৃষকদের বাদ দিয়ে শুধু মিলারদের কাছ থেকে চাল কেনায় সরকারি অর্থের অপচয় ও সিন্ডিকেট প্রসারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেখানে প্রান্তিক কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেখানে শুধু মধ্যস্বত্বভোগী মিল মালিকদের স্বার্থরক্ষায় সরকারি খাদ্য নীতি বাস্তবায়িত হওয়া নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, শুধু মজুত সর্বোচ্চ সেটা নয়। সরকারের এত চাল সংরক্ষণের সক্ষমতাও নেই। তারপরও এ কেনাকাটা শুধু একটি শ্রেণির স্বার্থ হাসিলের জন্য। এর যথেষ্ট কোনো যুক্তি নেই। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

তিনি বলেন, মিল মালিকরা বোরোতে এত আগ্রহী হলে সামনে আমন মৌসুমে ধানের দাম কমে যাবে। এতেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রয়োজনে সরকারের আমন মৌসুমে ধান সংগ্রহ বাড়ানো উচিত।

এনএইচ/এমকেআর/ এমএফএ

Original Source
https://www.jagonews24.com/economy/news/1157281
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Economy