গোলাম আজমকে জুতাপেটার ছবি টানানোর কারণ জানালেন অর্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আজমের জুতাপেটার ছবি টানানোর বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা অর্ক বড়ুয়া।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘উনাদের ইচ্ছা হয়েছে, তাই উনারা জিন্নাহর ছবি লাগিয়েছিলেন। আমাদেরও ইচ্ছা হয়েছে, তাই আমরা এটা লাগিয়ে দিয়ে এসেছি।’
অর্ক বড়ুয়া বলেন, সমস্যা শুধু ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি লাগানো নিয়ে নয়। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর ‘একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্যের ছবি রাখা হলেও ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে সভায় যারা ‘না, না’ বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, ভাষা মতিনসহ অন্যদের সেই প্রতিবাদের আর্কাইভ না রাখাই মূল সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা তখন, যখন আপনি ইতিহাসকে কেবল ৪৭ থেকেই গণনা করা শুরু করবেন। আমাদের এই অঞ্চলের ইতিহাস তো হাজার বছরের ইতিহাস। সাঁওতাল বিদ্রোহ, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা এবং নাম না জানা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সকল গণমানুষের গল্পই তো আমাদের ঐতিহাসিক সম্পদ।’
ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসের একপেশে উপস্থাপনের সমালোচনা করে অর্ক বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে সংরক্ষিত ইতিহাসের ‘একপেশে উপস্থাপন’ না করে জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের একটি পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ তৈরি করা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, ‘এম্নেতেই আমাদের এই অঞ্চলে যারা যখন ক্ষমতায় গেছে, তারা তাদের মতো করে ইতিহাসে দখলবাজি করে গেছে। আমাদের জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের একটা প্রকৃত ও পরিপূর্ণ আর্কাইভ নাই। ডাকসু সংগ্রহশালা সেই আর্কাইভটা হতে পারতো।’
ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা যথাযথভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘বরফকে বরফ ও পানিকে পানি বলার সততা না থাকলে সেটা ইতিহাস না। কাউকে অতিমানব করলে আসলে সত্যির লগে বেইমানি করা হয়।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সংগ্রহশালায় থাকা কিছু উপকরণের বিষয়েও মন্তব্য করেন অর্ক। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি আছে ৭২-৭৫ সালের, তাও তার ছেলের বিয়ের পেপার কাটিং এবং হেনতেন। কাউকে অতিমানব করলে আসলে সত্যির লগে বেইমানি করা হয়।’
ইতিহাসের খণ্ডিত বা একপেশে উপস্থাপনকে ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে উল্লেখ করে অর্ক বলেন, ‘আপনি যখন ইতিহাসের খণ্ড, অর্ধ বা একপেশে উপস্থাপন করবেন, তখন এটারে আর ইতিহাস বলে না, এটারে বলে ন্যারেটিভ।’
ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো দল, গোষ্ঠী, পক্ষের বাপের সম্পদ না যে সেখানে আপনি যা ইচ্ছা তা রাখতে পারেন, সরাতে পারেন, আপনার ইচ্ছামতো ন্যারেটিভ পুশ করতে পারেন।’
গোলাম আজমের প্রসঙ্গে অর্ক বলেন, ‘গোলাম আজম ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু দেশের জনগণের সঙ্গে বেইমানি করায় ৮১ সালে তাকে জুতাপেটা করাটা গণমানুষের গণপ্রতিরোধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—আপনি যে-ই হোন না কেন, দেশের মা-মাটির সঙ্গে বেইমানি করলে আপনার জন্য গণপ্রতিরোধ আসন্ন।’
সংগ্রহশালায় ছবিটি টানানোর বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অর্ক বড়ুয়া। তিনি বলেন, এসব কাজ প্রশাসনের করার কথা ছিল এবং প্রশাসন দায়িত্ব পালন করলে তাদের এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হতো না।
তিনি বলেন, ‘প্রশাসন তার কাজের কাজটা করলে আমাদের এই কাজ করতে হতো না। ডাকসুর সভাপতি হিসেবে ভিসি স্যারও এর দায় এড়াতে পারেন না।’
শেষে অর্ক বলেন, ‘আমরা খালি অতোটুকুই করেছি, যতটুকু আমাদের জায়গায় আপনারা থাকলেও করতেন, যে কোনো শিরদাঁড়াসম্পন্ন মানুষ করতো।’
ডাকসু প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও গণমানুষের সংগ্রামকে সর্বোচ্চ মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের উদ্যোগ প্রশাসনের নেওয়া উচিত।
এমআরএম



