কেমন ছিল আশির দশকের ফ্যাশন
আশির দশক মানেই যেন অন্যরকম এক উচ্ছ্বাস। ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে পপ গান, টেলিভিশনের পর্দায় ঝলমলে মিউজিক ভিডিও, আর ফ্যাশনে চলছে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সত্তরের দশকের তুলনামূলক নরম ও ডিসকো-নির্ভর স্টাইল পেরিয়ে আশির দশকে পোশাক হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। যতটা নজরকাড়া, ততটাই সাহসিতাই ছিল সেই সময়ের ফ্যাশনের ভাষা।
বিশাল শোল্ডার প্যাড, অতিরঞ্জিত চুলের কাটছাঁট দিয়ে সাজানো আর নিয়ন রঙের উজ্জ্বলতা সেই আশির দশক আজও ফ্যাশন সচেতনদের নস্টালজিক করে তোলে।গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অসংখ্য ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তারকারাও এই ট্রেন্ডে যোগ দিয়েছেন। ছবিগুলো রং ও আবহেও পুরোনো দিনের ছাপ। আশির দশকের পোশাক-আশাকের চল নিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু বলছিলেন, এআই দিয়ে তৈরি ছবিগুলো সেই সময়কে শতভাগ তুলে ধরতে না পারলেও তখনকার ফ্যাশন ও বিভিন্ন অনুষঙ্গের একটি ধারণা দিতে পারছে। কেমন ছিল সেই সময়ের ফ্যাশন? চলুন চোখ রাখা যাক আশির দশকের সেই আইকনিক স্টাইল স্টেটমেন্টগুলোতে।
চুলে যত ভলিউম, তত স্টাইল
চুলের কাটিংয়ের ক্ষেত্রে আশির দশকের মূলমন্ত্র ছিল এটাই-যত বড়, তত ভালো'। পার্ম করা কোঁকড়ানো চুল, ভলিউম দেওয়া 'বিগ হেয়ার', কিংবা ব্যাককম্ব করে ফোলানো চুল ছিল সে সময়ের ক্রেজ। মেকআপেও ছিল একই রকম সাহসী প্রকাশ। চোখের পাতায় নীল, বেগুনি কিংবা নিয়ন শেডের আইশ্যাডো, গালে স্পষ্ট ব্লাশ এবং ঠোঁটে উজ্জ্বল লাল বা গোলাপি লিপস্টিক-সব মিলিয়ে সাজে থাকত চোখে পড়ার মতো রঙের উপস্থিতি। আজকের মিনিমাল মেকআপের বিপরীতে আশির দশকের সৌন্দর্যচর্চা ছিল অনেক বেশি নাটকীয় ও প্রাণবন্ত।
চওড়া কাঁধ ও পাওয়ার ড্রেসিং
আশির দশকে নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে জানান দিতে শুরু করেন। এই সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছিল পোশাকেও। অফিসের ব্লেজার, স্যুট কিংবা জ্যাকেটে চওড়া কাঁধ তৈরি করতে ব্যবহার করা হতো শোল্ডার প্যাড। এর ফলে শরীরের গড়নে তৈরি হতো শক্তিশালী একটি সিলুয়েট, যা আত্মবিশ্বাস ও কর্তৃত্বের ভাব প্রকাশ করত।
এই প্রবণতা শুধু নারীদের পোশাকে সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরুষদের স্যুট ও ব্লেজারেও চওড়া কাঁধের কাটিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এভাবেই পাওয়ার ড্রেসিং আশির দশকের অন্যতম পরিচিত ফ্যাশন পরিচয়ে পরিণত হয়।
অ্যাসিড-ওয়াশ ডেনিম ও জিন্সের রাজত্ব
ডেনিমের ইতিহাসে আশির দশক ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বিশেষ করে অ্যাসিড-ওয়াশ জিন্স তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। হাঁটু ছাঁটা জিন্স, হাই-ওয়েস্টেড 'মম জিন্স', ঢিলেঢালা ডেনিম এবং ডেনিম জ্যাকেট তখনকার ক্যাজুয়াল ফ্যাশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ওভারসাইজড ডেনিম জ্যাকেটকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলতে অনেকে তাতে পিন, ব্যাজ বা প্যাচ লাগাতেন। ফলে একই পোশাকেও ফুটে উঠত ব্যক্তিত্বের আলাদা ছাপ।
পপ তারকাদের অন্ধ অনুকরণ
আশির দশকের ফ্যাশনকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে পপ সংস্কৃতির বিশাল ভূমিকা ছিল । তারকাদের মিউজিক ভিডিও, কনসার্ট ও স্টেজ পোশাক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত তরুণদের মধ্যে। তৎকালীন পপ তারকাদের দ্বারা লেস গ্লাভস, ফিশনেট স্টকিংস, লেয়ারড জুয়েলারি আর ক্রস প্যান্ডেন্ট পরে বিশ্ব মাত করেছিলেন।
মাইকেল জ্যাকসনের লাল লেদার জ্যাকেট, মেটালিক গ্লাভস ও সাদা মোজার সঙ্গে ছোট প্যান্টের স্টাইলের ট্রেন্ড চালু করেছিলেন। অন্যদিকে প্রিন্সের রাফল বা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের শার্ট, ঝলমলে স্যুট এবং সাহসী মঞ্চসজ্জা পুরুষদের ফ্যাশনে নতুন ধরনের পরীক্ষার পথ খুলে দেয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও সময়টির আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের প্রভাব দেখা যায়। বেলবটমের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমে সরু কাটের প্যান্ট, ঢিলেঢালা রঙিন শার্ট এবং বড় ফ্রেমের সানগ্লাসের মতো স্টাইল জায়গা করে নেয়।
স্প্যান্ডেক্স, লেগ ওয়ার্মার ও ফিটনেস ফিভার
আশির দশকে অ্যারোবিক্স ও ফিটনেস সংস্কৃতি শুধু শরীরচর্চার অভ্যাস বদলায়নি, পোশাকের ধরনেও প্রভাব ফেলেছিল। সেখান থেকেই ফ্যাশনে স্থান করে নেয় স্প্যান্ডেক্স, ব্রাইট লেগিংস, আর পায়ে পরা রঙিন 'লেগ ওয়ার্মার'। জিম সেশনের বাইরেও লেগ ওয়ার্মার আর হেডব্যান্ড তখন স্ট্রিট ফ্যাশনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।
নস্টালজিয়ার ফিরে আসা
ফ্যাশনের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য হলো- একসময় যে ট্রেন্ড পুরোনো হয়ে যায়, কয়েক দশক পর সেটিই আবার নতুন রূপে ফিরে আসে। আশির দশকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজকের ক্রপ টপ, ওভারসাইজড ব্লেজার, হাই-ওয়েস্ট জিন্স, বোল্ড সানগ্লাস কিংবা স্টেটমেন্ট শোল্ডারের মধ্যে সেই সময়ের ফ্যাশনের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।

ফরমাল পোশাকে গ্ল্যামারাস দেখালেন কিয়ারা
বর্তমানে আশির দশকের ফ্যাশন দেখে আমরা সহজে বুঝতে পারি কীভাবে কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজের ব্যক্তিত্বকে পোশাকের মাধ্যমে উজ্জ্বল করে তোলা যায়।
এসএকেওয়াই


