চোখের সুরক্ষায় ব্লু-কাট গ্লাসের চশমা কতটা উপকারী?
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাব কিংবা টেলিভিশন-দিনের বড় একটা সময় এখন কাটছে স্ক্রিনের সামনে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখার কারণে চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, ঝাপসা দেখা কিংবা মাথাব্যথার মতো সমস্যা অনেকেরই হয়। আর এসব থেকে বাঁচতে বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ব্লু-লাইট ব্লকিং’ বা ‘ব্লু-কাট’ চশমা। প্রচলিত ধারণা হলো, এই চশমা নাকি স্ক্রিনের ক্ষতিকর নীল আলো আটকিয়ে চোখকে সুরক্ষা দেয়। বর্তমানে এই শিল্পের বৈশ্বিক বাজারমূল্য ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি। তবে প্রশ্ন থাকে সত্যিই কি প্রতিদিন ব্লু-লাইট চশমা পরলে চোখ সুরক্ষিত থাকে? নাকি এটি মূলত একটি জনপ্রিয় ধারণা? সেটা নিয়ে প্রশ্ন দেখে যায়।
ব্লু-লাইট বা ব্লু-কাট গ্লাসের চশমা কী?
ব্লু-কাট গ্লাস বা লেন্স হলো এমন এক ধরনের বিশেষ চশমার কাঁচ, যা কম্পিউটার, মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভি স্ক্রিন থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর নীল আলো চোখে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এই লেন্সগুলোতে বিশেষ কেমিক্যাল কোটিং বা ন্যানো-প্রোটেকশন লেয়ার থাকে। এটি স্ক্রিনের ক্ষতিকর নীল আলোকে ফিল্টার করে বা প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু সাধারণ রঙের দেখতে কোনো সমস্যা করে না।
ব্লু-লাইট চশমা কিছু মানুষের কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে
ব্লু-লাইট বা ব্লু-কাট গ্লাসের চশমা কি চোখের ক্ষতি করে?
ব্লু-লাইট দৃশ্যমান আলোরই একটি অংশ। সূর্যের আলোতে যেমন এটি থাকে, তেমনি এলইডি ও ডিজিটাল স্ক্রিন থেকেও আসে। তবে স্ক্রিন থেকে আসা ব্লু লাইট চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে-এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির তথ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার বা ডিজিটাল স্ক্রিনের আলো চোখের ক্ষতি করে, এমন প্রমাণ নেই। সংস্থাটি কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য বিশেষ ব্লু-লাইট চশমা ব্যবহারের সুপারিশও করে না।
তাহলে স্ক্রিন দেখলে চোখ ক্লান্ত হয় কেন?
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় কম চোখের পাতা ফেলি। ফলে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে চোখে শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাছের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে ক্লান্তিও আসে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাথলিন পেট্রো বলেন, এ ধরনের সমস্যাকে সাধারণভাবে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলা হয়। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় চোখের পাতা কম পড়ায় চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যেতে পারে এবং সেখান থেকেই চোখে চাপ ও অস্বস্তি তৈরি হয়। তার মতে, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কম পলক ফেলা এবং দীর্ঘ সময় কাছের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকার মতো বিষয়গুলো চোখের অস্বস্তির পেছনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্লু-লাইট চশমা কি কোনো উপকারই করে না?
ব্লু-লাইট চশমা চোখে পৌঁছানো নীল আলোর একটি অংশ কমাতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এটি চোখের রোগ বা স্ক্রিনজনিত চোখের ক্লান্তি প্রতিরোধ করবে।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নিকোল বাজিক জানিয়েছেন, গবেষণায় ব্লু-লাইট চশমা চোখের ক্লান্তি কমাতে কার্যকর-এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কেউ এগুলো ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে আরাম অনুভব করলে তা পরা ক্ষতিকর নয়।
একইভাবে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মুরিয়েল শর্ন্যাক বলেন, কিছু মানুষ ব্লু-লাইট ফিল্টার চশমা পরে স্বস্তি অনুভব করতে পারেন। তবে চোখের ম্যাকুলা সুস্থ রাখা বা ঘুমের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে এসব চশমা প্রয়োজনীয়-এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
কোচরেনের একটি পর্যালোচনায় ১৭টি গবেষণায় মোট ৬১৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে স্বল্পমেয়াদি চোখের ক্লান্তি কমাতে সাধারণ লেন্সের তুলনায় ব্লু-লাইট ফিল্টারিং লেন্সের উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়ার প্রমাণ নেই।
চক্ষু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও মোটামুটি একই দিকে। আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির তথ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার স্ক্রিনের আলো চোখের ক্ষতি করছে- এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই শুধু কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য বিশেষ ধরনের চশমা পরার সুপারিশও তারা করে না।
চোখ ভালো রাখতে যা করবেন
স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাজ করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত বিরতি নেওয়া। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে মাঝেমধ্যে দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান। সচেতনভাবে চোখের পাতা ফেলুন এবং চোখ অতিরিক্ত শুষ্ক মনে হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ঘরের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখাও জরুরি। খুব অন্ধকার ঘরে অত্যন্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার না করাই ভালো। কাজের সময় স্ক্রিনের অবস্থান ও দূরত্বও আরামদায়ক হওয়া উচিত।
স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাজ করলে একটানা তাকিয়ে না থেকে নিয়মিত বিরতি নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলতে পারেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকান। এতে কাছের বস্তুর দিকে একটানা ফোকাস করার চাপ থেকে চোখকে কিছুটা বিরতি দেওয়া যায়। এতে চোখের ক্লান্তি কমে।

অ্যালার্ম বাজলেও সকালে ঘুম ভাঙে না কেন?
রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার কমানোও উপকারী হতে পারে। কারণ রাতে আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

শিশুদের মতো রং করুন, কমবে মানসিক চাপ
ব্লু-লাইট বা কাটের চশমা পরলে কারো ব্যক্তিগতভাবে আরাম লাগতেই পারে। তবে এগুলোকে চোখের স্থায়ী ক্ষতি থেকে রক্ষার নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। চোখে নিয়মিত ব্যথা, ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত শুষ্কতা বা অন্য কোনো সমস্যা হলে শুধু ব্লু-লাইট বা কাটের চশমার ওপর নির্ভর না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
এসএকওয়াই

