বিবেকের চোখে গণতন্ত্র ও নৈতিকতা
আজ আর্ন্তজাতিক গণতন্ত্র দিবস। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য হলো'Raising Hands and Voices-Fostering Agency and Ownership through Deliberative Democracy' (হাত ও কণ্ঠস্বর উত্তোলন পরামর্শমূলক বা আলাপ- আলোচনামূলক গণতন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব ও মালিকানা বৃদ্ধি করা)।
আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রের চর্চায় মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আর গণতন্ত্রকে একটি রাষ্ট্রশাসন পদ্ধতি হিসেবে আধুনিক ও সমকালীন যুগে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে প্রতিষ্ঠা করা। তবে ব্যাপক অর্থে এটি একটি জীবনাদর্শ। এই জীবনাদর্শ একটি বিশেষ ধরনের নৈতিক জীবনের দিকনির্দেশনা দেয় যে নৈতিক আদর্শকে আমরা গণতান্ত্রিক নৈতিকতা বলে চিহ্নিত করতে পারি।
সমকালীন বিশ্বে যে উদার নৈতিক গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে বা চর্চা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার প্রধানতম তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে উপযোগবাদ। এটি ইংরেজ দার্শনিক বোথাম ও জে এস মিল প্রমুখের প্রণীত একটি বিশেষ নীতিদার্শনিক মতবাদ। মানুষের সর্ব প্রকার ঐচ্ছিক আচরণের আদর্শ বা নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে এই মতবাদ প্রদান করা হয়েছে।
উপযোগবাদের মূল স্লোগান হচ্ছে-এই মতবাদ অনুযায়ী যে কাজ বা আচরণ সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক পরিমাণে সুখ, আনন্দ বা শান্তি নিশ্চিত করতে পারে সেই কাজই ভালো বা নৈতিক। এই নৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যে সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হতে পারে তাকেই উদার নৈতিক গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্র বলা চলে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ ও শাসককে এমন নীতি বা আদর্শ অনুসরণের জন্য আন্তরিক হওয়া উচিত, যে নীতি বা আদর্শ সর্বসাধারণের বা অন্তত অধিক সংখ্যক নাগরিকের কল্যাণ বয়ে আনবে। তবে সর্বসাধারণের কল্যাণ কোন বিশেষ কাজ বা কর্মপদ্ধতির মধ্যে নিহিত সে বিষয়ে নানা রকম মত থাকতে পারে। আর এই নানা রকম মতের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকে, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও কর্মসূচি থাকে। এসব আদর্শ ও কর্মসূচির লক্ষ্য হওয়া উচিত সার্বজনীন কল্যাণ।
প্রত্যেক দল যদি জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। কোন দল কত ভালো কাজের ফর্মুলা বের করতে পারবে তার ওপর ভিত্তি করেই দলের মূল্যায়ন হবে। জনগণ সেই দলের পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করবে। শ্রেফ এই হচ্ছে গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক কথা। আমাদের দেশ একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখানে পর্যাপ্তভাবে বিকাশ লাভ করেনি।
গণতন্ত্র এখানে সর্বজনকল্যাণতন্ত্র না হয়ে দলতন্ত্র, ব্যক্তিগত ফায়দাতন্ত্র এমনকি বিশৃঙ্খলাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই জনকল্যাণের ফর্মুলা প্রবর্তনের চাইতে ক্ষমতা লাভের ফর্মুলা প্রণয়নের জন্যই সচেষ্ট থাকে। মাঝেমধ্যে সেই ফর্মুলা অনেকটা নির্মম হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতা এখানে শক্তির, আদর্শের নয়। স্বার্থটা এখানে ব্যক্তি বা দলের; দেশ, জাতি, জনগণের স্বার্থ এখানে মুখ্য নয়। তাই বাস্তবিকভাবে এটি কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নয়।
গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে এসব সংকীর্ণ স্বার্থতন্ত্র প্রচলিত আছে বিধায় এ দেশের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না। গণতন্ত্রের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের প্রতি শ্রদ্ধা। কোনো রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচিকে যত বেশি সংখ্যক মানুষের আস্থায় নিতে পারবে সেই দল ততই সফল হবে। কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তির সুযোগ এখানে নেই। যে দলের কর্মসূচি বা আদর্শ অধিক সংখ্যক লোক সমর্থন দেবে সেই দলই ক্ষমতায় যাবে, রাষ্ট্র শাসন করবে এবং সর্বাধিক লোকের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করবে। এই কাজে পরাজিত দল বা বিরোধী দলকেও তারা আস্থায় নিতে চেষ্টা করবে। বিরোধী দলও সরকারের জনকল্যাণকর কর্মকাণ্ডে সমর্থন দেবে-এটাই হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
কেএসকে



