শহুরে ডেঙ্গুর থাবায় আক্রান্ত প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চল
পুরো দেশের মতো উত্তরের জেলাগুলোতেও বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। সরকারি হিসাব মতে, গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ না করলেও চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময়ে রংপুর বিভাগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সেইসঙ্গে গত বছরের তুলনায় বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও।
একসময়ের শহুরে রোগ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু এখন আর কেবল রাজধানী বা বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ভয়াল রূপ ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। দিন যত যাচ্ছে, গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের মাঝেও ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক তত তীব্র আকার ধারণ করছে। তবে একটু সচেতন হলেই এর থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী কিংবা বড় শহর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যখন গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন, তখন স্থানীয় এডিস মশা তাকে কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস বহন করছে। পরবর্তীতে সেই মশার মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদেও ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। তাছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র জমে থাকা বৃষ্টির পানি এবং সচেতনতার অভাবের কারণে গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

শুধু হাসপাতালের প্রস্তুতি নয়, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর পক্ষ থেকে ড্রেন পরিষ্কার এবং মশক নিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম জোরদার করা জরুরি। লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আতঙ্কিত না হয়ে চারপাশ পরিষ্কার রাখা- এটাই এখন ডেঙ্গু থেকে বাঁচার মূল উপায়।
নগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসাব্যবস্থা ও রোগ নির্ণয় সুবিধা সীমিত হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের বড় একটি অংশ সময়মতো সঠিক চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পরই কেবল তাকে উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে গ্রামীণ পর্যায়েও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, একইসঙ্গে সাধারণ জ্বর কিংবা সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া জরুরি।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) সকাল পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় শুধু রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালেই ডেঙ্গু নিয়ে ৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর ২৪ ঘণ্টায় (১৪ সেপ্টেম্বর সকাল আটটা থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল আটটা) আট জেলার সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৬৫ জন।
তথ্যমতে, চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত রংপুর জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ৪১৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়া নীলফামারী জেলায় ২১০ জন, দিনাজপুর জেলায় ২০৩ জন, কুড়িগ্রামে ১৭২ জন, গাইবান্ধায় ১৪৯ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ১২৩ জন, লালমনিরহাটে ১০৮ জন এবং পঞ্চগড় জেলায় ১০৫ জনসহ মোট ১৪৮৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এরমধ্যে কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতালে দুইজন, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন মারা গেছেন। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ১৩৪৮ জন। চিকিৎসাধীন ১৩৫ জন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পীরগঞ্জ উপজেলার মিনারা বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে রংপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মিঠাপুকুর উপজেলার জান্নাতি খাতুন নামে এক নারী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র জানায়, মিনারা বেগম ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রংপুরে আসার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

অন্যদিকে জান্নাতি খাতুন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে রমেক হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হঠাৎ করে রোগীর এই চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। ডেঙ্গু একদিকে যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে, তেমনি শহর ছাড়িয়ে ঝুঁকি বাড়িয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।
কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবীব বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাই সামান্য জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেই তা অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আশেপাশে ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব বা যেকোনো পরিত্যক্ত পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া মশক নিধনে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষকেও স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান এই চিকিৎসক।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়নি। তবে রোগীর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটস এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি রয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দুই বছরে রংপুরের আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সরকারি মেডিকেলে মারা গেছে ১৪ জন। এর বাইরে বেসরকারি মেডিকেল ও বাড়িতেও মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ রংপুর বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে মোট আক্রান্ত রোগী ছিল ২৬৫ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪৭ জন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৪ জন। এর বাইরে ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে ১০ জন, নীলফামারী হাসপাতালে ৩২ জন, পঞ্চগড় হাসপাতালে নয়জন, লালমনিরহাটে সাতজন, কুড়িগ্রামে চারজন এবং গাইবান্ধায় দুজন।
২০২৩ সালে এ বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৪৯৪ জন। মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল দিনাজপুরে পাঁচজন। এরপর রংপুরে চারজন, গাইবান্ধায় দুজন ও লালমনিরহাটে একজন। ওই বছর বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে রংপুরে এক হাজার ২৯৫ জন। এরমধ্যে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬০ জন। এছাড়া গাইবান্ধায় এক হাজার ৪৪ জন, দিনাজপুরে ৮৮৩ জন, নীলফামারীতে ৭৬৫ জন, কুড়িগ্রামে ৭০৮ জন, লালমনিরহাটে ৩০৩ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০৯ জন ও পঞ্চগড়ে ১৮৭ জন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট জেলায় মোট আক্রান্ত হয় এক হাজার ৪৭২ জন। এর মধ্যে বেশি রোগী দিনাজপুরে ৩৪৪ জন, নীলফামারীতে ৩০১, কুড়িগ্রামে ২১৭, গাইবান্ধায় ১৪৬, রংপুরে ১৯৭, লালমনিরহাটে ৬৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৭ এবং পঞ্চগড়ে ১১৮ জন। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এর মধ্যে গাইবান্ধায় একজন এবং নীলফামারীতে একজন।
২০২৫ সালে আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১১৮৭ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল দিনাজপুর জেলায় ২৫৬ জন। এরপর রংপুরে ২৪৪ জন, নীলফামারী জেলায় ২০৭ জন, গাইবান্ধায় ১৬২ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯৯ জন, লালমনিরহাটে ৯৬ জন এবং কুড়িগ্রাম জেলায় ৩৫ জন। ওই বছর কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
এদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪ জন। এরমধ্যে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলায় মোট ১১ জন, গাইবান্ধা জেলায় ১০ জন, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ৮ জন করে, দিনাজপুরে ৪ জন এবং ঠাকুরগাঁও জেলায় ৩ জন। ওই সময় পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গা, বাড়ির ছাদ বা যেসব স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যেতে পারে সেসব জায়গা শনাক্ত করে তা ধ্বংসে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রংপুর বিভাগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু যেন না হয় সেজন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধন, মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল পর্যন্ত ৩৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ কর্নার চালুসহ ৩৮টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে আক্রান্ত হওয়ার আগেই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন আশিকুর রহমান।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন জানান, রংপুর সিটি করপোরেশন থেকে আগামী তিন মাস ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে, যে জায়গাগুলোতে মশার প্রজনন ক্ষেত্র আছে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে যেন মশার প্রজনন স্থানটাকে ধ্বংস করা যায়। তার পাশাপাশি প্রত্যেকটি ওয়ার্ডকে একটি রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে এবং সেই রুটিন ওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট সময়ে ফগিং করা হবে।
সিটি প্রশাসক আরও বলেন, এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির প্রয়োজন সেটি হচ্ছে জনসচেতনতা। কারণ জনসচেতনতা ছাড়া শুধু সিটি করপোরেশন যত পদক্ষেপই নিক না কেন শতভাগ ডেঙ্গুমুক্ত রংপুর করতে পারবে না।
এফএ




