ভাঙার আগে শেষ দেখা: মগবাজারের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী হাউজ
এলিজা বিনতে এলাহী
‘ম্যাডাম আপনি কি কুকুর ভয় পান?’ রাজশাহী হাউজের দরজা খুলে একজন তরুণী জানতে চাইলেন।
হ্যাঁ পাই তো!
‘তাহলে একটু দাঁড়ান’।
অল্প সময় পরে তরুণীটি হাসিমুখে দরজা খুলে বললেন ‘ভেতরে আসুন’!
প্রবেশ মুখে একটি খালি স্থান, তারপর কয়েকটি সিঁড়ি। সিঁড়ি পেরিয়ে গেলে একটি করিডোর। করিডোরের একটি চেয়ারে বসে আছেন জনাব ইরতেজা রেজা চৌধুরী। রাজশাহী হাউজের বর্তমান মালিক, এই বাড়ির উত্তরসুরী। প্রবেশ করতেই তিনি বলে উঠলেন ‘কুকুর ভয় পাও কেন? তোমাকে তুমি করেই বললাম, আমার বয়স ৭৬ বছর’। আসলে এই কেন-এর উত্তর নেই আমার কাছে। আমার আম্মুর বাসায় কুকুরের সংখ্যা ১১টি। তারপরও…!
জনাব চৌধুরী যেখানে বসে আছেন সেখান থেকে একটি সিঁড়ি দোতলায় চলে গেছে। রাজশাহী হাউজ একটি দ্বিতল ভবন। সিঁড়ির দেয়ালজুড়ে চারটি পুরোনো ছবি। সিঁড়ি বেশ প্রশস্ত। ঔপনিবেশ পরবর্তী ঢাকায় পঞ্চাশের দশকের বাড়িগুলো যেমন ছিল এই বাড়িটিও ঠিক তেমনি। একেবারে সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। ছবিগুলোর পরিচয় দিলেন জনাব চৌধুরী–আমার দাদা, বড় দাদা, আমার নানা, আমার আব্বা। ধীরে ধীরে পুরো বাড়িই ঘুরে দেখলাম। প্রতিটি আসবাব, দেয়ালের পেইন্টিং, ঝাড়বাতি সবকিছুতেই রয়েছে রুচি ও আভিজাত্যের ছাপ। কিছু কিছু ঝাড়বাতি ও আসবাব শত বছরের পুরোনো, যেগুলো আনা হয়েছে পুর্বপুরুষের বাড়ি থেকে।
মগবাজারে অবস্থিত এই বাড়িটি ঔপনিবেশিক-পরবর্তী ঢাকার আধুনিক স্থাপত্যের ভাষাকে তুলে ধরে। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকার নতুন অঞ্চলে বসবাস শুরু করা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য নির্মিত সাধারণ বাড়িগুলোর মতোই। রাজশাহী হাউস একটি নতুন আবাসিক ধরন ও জীবনযাত্রার সূচনাকে প্রতিনিধিত্ব করে।
বাড়িটির নকশা করেছিলেন কলকাতার স্থপতি অর্জুন রায়। বাড়ির প্রবেশপথের ওপর ঝুলন্ত ক্যান্টিলিভার আকৃতিটি নিঃসন্দেহে বাড়ির সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য, যা সেই সময়ে অনন্য এক পদ্ধতিতে নির্মিত হয়েছিল।
দক্ষিণমুখী একটি বড় বারান্দা বাড়ির সবচেয়ে স্বতন্ত্র উপাদান। বারান্দা থেকে কক্ষে যাতায়াতের মধ্য দিয়ে অন্দর ও বহির্মহলের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে।
বাড়িটি ঢাকার অন্যান্য অনেক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই সামনের লন-সহ একটি বাংলো-ধরনের বাড়ির বৈশিষ্টের অনুরূপ। প্রকৃতপক্ষে, প্রথম দিকে বাড়ির উত্তর দিকটি ছিল বড় গাছপালাসহ একটি বাগান এবং কিছু কর্মচারী কোয়ার্টার। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে, সম্পত্তি বিভাজনের পর, বাগান এলাকাটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্টে রূপান্তরিত হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ‘হিডেন হেরিটেজ: হোমস ইন ঢাকা’ কি?
প্রকল্পটি ‘সাইলেন্ট হেরিটেজ: বিল্ডিংস ইন বাংলাদেশ’ একটি বৃহত্তর গবেষণা উদ্যোগের অংশ, যা গ্রামীণ থেকে শহুরে এবং মুঘল থেকে আধুনিক—বিভিন্ন যুগের বাড়িঘর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ওপর কেন্দ্রীভূত। বিশ শতকের বিভিন্ন সময়ের ৫টি বাড়ি নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি বাড়ি বিভিন্ন সময়ের এক একটি স্মারক স্থাপত্য।

২০০ দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা এলিজার
হিডেন হেরিটেজ দল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক তালিকার বাইরেও অনুসন্ধান চালিয়ে এমন প্রতিটি বাড়ি নির্বাচন করেছে যা নির্বাচনি মানদণ্ডের সাথে খাপ খায় এবং নথিভুক্তকরণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিছু ক্ষেত্রে, দলকে একটি নির্বাচিত বাড়ি পরিদর্শন এবং আংশিক নথিভুক্তকরণ সম্পন্ন করার পরেও পিছিয়ে আসতে হয়েছে এবং তা ছেড়ে দিতে হয়েছে।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা কিছু দিক তুলে ধরছি - স্থাপত্যগত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা, ঐতিহাসিক, আর্কাইভাল ও শিক্ষামূলক মূল্য, মানুষের জীবন ও সময়কাল নথিভুক্ত করা।
বাড়িগুলো নির্বাচন হলো কীভাবে?
প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ঢাকার ইতিহাসের স্বতন্ত্র যুগ বা সংস্কৃতির অনুকরণীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করা। প্রতিটি নির্বাচিত ভবনের স্বতন্ত্র স্থাপত্য ও স্থানিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মাত্রা ও পরিধির দিক থেকে, নির্বাচিত ভবনগুলো আবাসিক স্থানের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য। বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি ঢাকার ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বের ভবনগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেন। বিস্তৃত তালিকা থেকে, এই পর্যায়ে নথিভুক্তকরণের জন্য পাঁচটি বাড়ি নির্বাচন করা হয়েছে।
হিডেন হেরিটেজ প্রকল্পটি বেঙ্গল ইনস্টিটিউট এবং ইউনিক ক্লাস্টার বাংলাদেশ কর্তৃক পরিকল্পিত ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এটি বেঙ্গল ইনস্টিটিউট দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদল এবং ইউনিক ক্লাস্টার বাংলাদেশের সকল সদস্যের সহায়তায় বাস্তবায়ন হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বাড়িটির নাম কেন রাজশাহী হাউজ!
জনাব চৌধুরীর পূর্বপুরুষ এসেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকোশা গ্রাম থেকে। তার পূর্বপুরুষ সেই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। জমিদারির বয়স দুশো বছর। রাজশাহী হাউজ এর মূল মালিক প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুর্তজা রেজা চৌধুরী। রাজশাহী হাউজের নির্মাণকাল ১৯৫৭। বর্তমান মালিক ইরতেজা রেজা চৌধুরী জানিয়েছেন মূল বাড়িটির পুরো চত্বরের আয়তন ছিল ৬ বিঘা।
তবে রাজশাহী হাউজ আর টিকে থাকছে না। সময়ের প্রয়োজনে ও নতুন বাস্তবতায় ভেঙ্গে ফেলা হবে রাজশাহী হাউজ। বহুতল ভবন নির্মান হবে খুব শিগগিরই। বাড়ির চত্বরে বিল্ডার্স কোম্পানির বোর্ড ঝুলছে।
অল্প দিন পরেই চিরতরে হারিয়ে যাবে রাজশাহী হাউজ। ৫টি হিডেন হেরিটেজ হোমস থেকে মুছে যাবে রাজশাহী হাউজের নাম। তাই শেষবেলায় দেখতে গিয়েছিলাম রাজশাহী হাউজ।
ইরতেজা রেজা চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা নাসিম চৌধুরীর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছি। দুজনেই সানন্দে পুরোনো দিনের গল্প করেছেন। মনে হচ্ছিল আমরা বহুকালের পরিচিত।
এমআরএম
