চর জাগে-বসতি গড়ে, ভোগান্তিতে কাটে না ৩০ হাজার মানুষের
নদী ভাঙে, চর জাগে- আর সেই চরে গড়ে ওঠে নতুন বসতি। যমুনার ভাঙন-বন্যার সঙ্গে বছরের পর বছর লড়াই করে টিকে আছেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। বর্ষায় ভাঙন ও বন্যার আতঙ্ক, আর পানি কমলেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাসহ নিত্যদিনের দুর্ভোগ-এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
যমুনার বুকের এসব দুর্গম চরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও তারা এখনো নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, এমনকি উপজেলা সদরের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি মৌলিক নাগরিক সুবিধা পেতেও প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের।
চিকিৎসা পেতে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল যমুনা
চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা যায় স্বাস্থ্যসেবায়। সাপধরী ও চিনাডুলী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়মিত খোলা পাওয়া যায় না। ফলে অসুস্থ হলে চরবাসীর শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
‘চরাঞ্চলে পাঠদান ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমাদের কাছে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে। বিষয়গুলো আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি, যাতে চরাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান।’
চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদরে যেতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই নৌকায় যমুনা পাড়ি দিতে হয়। নদীতে পানি বাড়লে স্রোত ও ঢেউয়ের সঙ্গে বাড়ে ঝুঁকি। আর রাতে জরুরি রোগী নিয়ে যাত্রা হলে দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

ঝোপঝাড়ে বিলীন সোয়া কোটি টাকার সড়ক
প্রসূতি মায়েদের জন্য প্রতিটি যাত্রাই ঝুঁকিপূর্ণ
চরাঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে প্রসূতি মায়েদের ক্ষেত্রে। প্রসববেদনা উঠলে উত্তাল যমুনা পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে হাসপাতালে যেতে হয়। রাতের অন্ধকার, নদীর ঢেউ ও দীর্ঘ পথ, সব মিলিয়ে প্রতিটি যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।
সময়মতো চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। দুর্গম চরাঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় অসুস্থ রোগী ও স্বজনদের নির্ভর করতে হয় নদীপথের ওপর।
‘উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন সাপধরীর দুর্গম চরাঞ্চল। চরবাসীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।’
এরই বাস্তবচিত্র দেখা যায় চর শিশুয়া গ্রামের আকলিমা বেগমের ক্ষেত্রে। ১০ মাস বয়সের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে এসে সেটি বন্ধ দেখতে পান তিনি। চিকিৎসা না পেয়েই শিশুকে নিয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে। দুর্গম চরে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় উপজেলা হাসপাতালই তাদের শেষ আশ্রয়।

বিদ্যালয় আছে, নিয়মিত পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন
শুধু চিকিৎসা নয়, শিক্ষাতেও পিছিয়ে রয়েছে চরাঞ্চলের শিশুরা। দুর্গম এলাকাগুলোতে রয়েছে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাত্র একটি উচ্চ বিদ্যালয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও বিদ্যালয় ভবন থাকলেও নিয়মিত পাঠদান হয় না।
শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, যোগাযোগ সংকট এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিশুরা। নদীর পানি কমে গেলে অনেক চর কার্যত আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়ে ওঠে।
‘ইউনিয়নজুড়ে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মাসে এক-দুদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা যায়। অধিকাংশ সময়ই ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ফলে চিকিৎসা নিতে আমাদের উপজেলা সদরে যেতে হয়।’
চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় অনেক পরিবার সন্তানদের বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করছেন।
স্থানীয়রা জানান, সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবেশ ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না হওয়ায় অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করছেন।
এতে চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষাজীবনে বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য শুধু বিদ্যালয় ভবন নয়, নিয়মিত শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদান ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যোগাযোগ সংকটে থমকে যায় স্বাভাবিক জীবন
চরাঞ্চলের মানুষের প্রায় সব ধরনের নাগরিক সেবার জন্য উপজেলা সদরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু দুর্গম চরগুলো থেকে উপজেলা সদরে যাতায়াত সহজ নয়। নৌপথনির্ভর যোগাযোগের কারণে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে দুর্ভোগের ধরন বদলালেও সংকট থেকে যায়।
জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা সরকারি সেবা নিতে উপজেলা সদরে যাওয়ার ক্ষেত্রে চরবাসীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। নদীর পানি ও আবহাওয়ার ওপর যোগাযোগ অনেকটা নির্ভরশীল হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে কতটা দূরে চরবাসী
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যমুনার বুকে বসতি গড়ে তোলা মানুষগুলো প্রতিকূলতার সঙ্গে অনেকটাই অভ্যস্ত। নদীভাঙনে ঘর হারান, বন্যায় ফসল হারান, আবার নতুন চরে নতুন করে জীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৃতির এই লড়াইয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগের মতো মৌলিক অধিকার পেতেও যদি প্রতিদিন তাদের যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়-উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে তারা কতটা দূরে।
চরবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দুর্গম চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত চালু রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যমুনার বুকের এসব মানুষের চাওয়া-দয়া না, তারা চান ন্যায্য নাগরিক অধিকার।

সাপধরী মন্ডলপাড়া গ্রামের আমিনুর ইসলাম বলেন, ইউনিয়নজুড়ে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মাসে এক-দুদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা যায়। অধিকাংশ সময়ই ক্লিনিক বন্ধ থাকে। ফলে চিকিৎসা নিতে আমাদের উপজেলা সদরে যেতে হয়।
সাপধরী এলাকার আব্দুল হাকিম প্রামাণিক বলেন, বিদ্যালয় ভবন থাকলেও অনেক শিক্ষক নদী পার হয়ে নিয়মিত আসতে চান না। ফলে শিক্ষার্থীরাও স্কুলমুখী হতে চায় না। বিশেষ করে নদীর পানি কমে গেলে যোগাযোগ সংকট আরও বেড়ে যায়। বিদ্যালয়ে পড়াশোনা কম হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করছেন।
একই এলাকার আবেদ আকন্দ বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ যেন অবহেলিত। মনে হয় তারা এ দেশের নাগরিক না। তা না হলে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা এত দুর্বল থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সাপধরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম মন্ডল বলেন, উপজেলা সদর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন সাপধরীর দুর্গম চরাঞ্চল। চরবাসীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ মো. জুবায়ের বলেন, চরাঞ্চলে পাঠদান ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমাদের কাছে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে। বিষয়গুলো আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি, যাতে চরাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আলাদাভাবে দেওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা সীমিত। কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নেওয়া হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
এনএইচআর/এএসএম




