বিশ্বজুড়ে কি শুরু হয়েছে গোপন কোনো মহাযুদ্ধ?
চারপাশে শুধু বারুদের গন্ধ। কান পাতলে শোনা যায় সাইরেনের আর্তনাদ। পৃথিবীর মানচিত্র যেন আজ ক্ষতবিক্ষত এক ক্যানভাস। একের পর এক দেশ জড়িয়ে পড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। প্রশ্ন একটাই, একসঙ্গে আর কত যুদ্ধ দেখবে বিশ্ব?
মানবসভ্যতা আজ এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শান্তির বাণী কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বিশ্বমোড়লদের ক্ষমতার লড়াই আর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কোটি কোটি মানুষ আজ গৃহহীন। খাদ্য সংকট আর অর্থনৈতিক ধস গ্রাস করছে দেশকে দেশ।
উপ্পসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের (UCDP) হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র জড়িত এমন সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল ৬৫টি। এর মধ্যে ১৩টি সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর রাষ্ট্র-সম্পৃক্ত সংঘাতের এ সংখ্যা সর্বোচ্চ।
২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র আরও জটিল হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা মধ্যপ্রাচ্য। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন এবং সাম্প্রতিক সৌদি-হুথি সংঘাত উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যপ্রাচ্যের বড় ঝুঁকি

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ সপ্তম মাসে গড়িয়েছে। সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও বিভিন্নভাবে এতে যুক্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে তেল, জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়ছে।
১৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ আবারও যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টাও চলছে। তবে যুদ্ধ পুরোপুরি থামার নিশ্চয়তা এখনো দেখা যায়নি।
রাশিয়া-ইউক্রেন: পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি যুদ্ধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ইউরোপের সবচেয়ে বড় চলমান সংঘাত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে লড়াই চলছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনও রুশ সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের কিছু এলাকায় পাল্টা অভিযান চলছে।
শান্তি আলোচনার উদ্যোগও চলছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত থাকায় স্থায়ী সমঝোতার পথ এখনো কঠিন।
এই যুদ্ধের আরেকটি উদ্বেগ হলো এর সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের পাশাপাশি ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোতেও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন-লেবানন: এক সংঘাত, বহু ফ্রন্ট

গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে আছে। ইসরায়েল ও হামাসের লড়াইয়ের পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতও বড় আকার নিয়েছে।
২০২৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। হামলা, বাস্তুচ্যুতি এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
এ সংঘাতের বিশেষত্ব হলো, গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ আলাদা হলেও দুটির সঙ্গে একই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একটি ফ্রন্টে উত্তেজনা বাড়লে অন্য ফ্রন্টেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরব-হুথি: পুরোনো যুদ্ধের নতুন মোড়
ইয়েমেনের দীর্ঘ যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়নি। হুথি বাহিনী এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত বিভিন্ন সময়ে কমলেও ২০২৬ সালে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের দিকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করলেও মক্কাকে নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইয়েমেনের পরিস্থিতি শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিষয় নয়। বাব আল-মান্দেব এবং লোহিত সাগরের নৌপথও এর সঙ্গে জড়িত। ফলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে।
সুদানের গৃহযুদ্ধ: ভুলে যাওয়া এক ভয়াবহ সংকট

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানে সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী আরএএফের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। খার্তুমসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধান মিশন বলেছে, সংঘাতে বাইরের পক্ষগুলোর সমর্থন যুদ্ধকে আরও জটিল করছে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি বাড়াচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে রক্তের খেলা

বিশ্বের যুদ্ধের তালিকা শুধু মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানে সীমাবদ্ধ নয়। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত এবং গণতন্ত্রপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর লড়াই চলছে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে সরকারপন্থি বাহিনী ও এম২৩সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত অব্যাহত।
সোমালিয়ায় আল-শাবাবের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনী লড়ছে। সাহেল অঞ্চলের মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংঘাতও বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানে তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএসসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাত রয়েছে। পাকিস্তানেও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
কলম্বিয়ায় সরকার, ইএলএন এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত চলছে। হাইতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সশস্ত্র গ্যাংগুলোর সহিংসতাও বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছে।
শান্তির অন্বেষণ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
যুদ্ধের এই আগুনে কেবল মানুষই পুড়ছে না, ধ্বংস হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় হচ্ছে মানবকল্যাণের কোটি কোটি ডলার। অথচ এই অর্থ দিয়ে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব ছিল।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ক্ষমতার অন্ধ মোহে বিশ্বনেতারা আজ অন্ধ। যদি এই সংঘাত দ্রুত থামানো না হয়, তবে পুরো মানবজাতি এক ধ্বংসাত্মক ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। বিশ্ববাসীর একটাই প্রার্থনা, অস্ত্র সংবরণ করুন, শান্তি ফিরিয়ে দিন।
তথ্যসূত্র: উপ্পসালা ইউনিভার্সিটি, টাইম, আল-জাজিরা, রয়টার্স
কেএএ/










