পৃথিবীর অদৃশ্য ঢাল রক্ষার যে গল্প

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
সূর্যের আলো ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সেই সূর্যই এমন কিছু অদৃশ্য রশ্মি ছড়িয়ে দেয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় পৃথিবীর প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এই বিপজ্জনক অতিবেগুনি রশ্মির বড় অংশকে আটকে দিয়ে পৃথিবীকে সুরক্ষা দেয় বায়ুমণ্ডলের একটি প...

সূর্যের আলো ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সেই সূর্যই এমন কিছু অদৃশ্য রশ্মি ছড়িয়ে দেয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় পৃথিবীর প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এই বিপজ্জনক অতিবেগুনি রশ্মির বড় অংশকে আটকে দিয়ে পৃথিবীকে সুরক্ষা দেয় বায়ুমণ্ডলের একটি পাতলা স্তর। সেটিই ওজোন স্তর। অথচ একসময় মানুষের তৈরি রাসায়নিকের কারণে সেই সুরক্ষাকবচই ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছিল। সেই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পই আন্তর্জাতিক ওজোন দিবসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য প্রিজারভেশন অব দ্য ওজোন লেয়ার’। দিনটি শুধু একটি পরিবেশ দিবস নয়, বরং বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। কারণ ওজোন স্তরের সংকট দেখিয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ড যেমন পৃথিবীর পরিবেশকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে, তেমনি বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেই ক্ষতি অনেকাংশে কাটিয়েও ওঠা সম্ভব।

পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডলের একটি উচ্চস্তর হলো স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। এই স্তরের মধ্যে ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে রয়েছে ওজোনের ঘনত্বপূর্ণ অঞ্চল। ওজোন মূলত তিনটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত একটি গ্যাস। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ওজোন বায়ুদূষণের জন্য ক্ষতিকর হলেও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোনের ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি অনেকটা পৃথিবীর জন্য বিশাল এক সানগ্লাসের মতো কাজ করে। সূর্যের আলো ও তাপ যেমন পৃথিবীতে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয়, তেমনি সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির প্রায় সবটাই ওজোন স্তর শোষণ করে নেয়।

এই সুরক্ষা না থাকলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাত। মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। ত্বকে তীব্র রোদে পোড়া, চোখে ছানি এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শুধু মানুষ নয়, অতিরিক্ত অতিবেগুনি বিকিরণ প্রাণিজগতের জন্যও ক্ষতিকর।

উদ্ভিদও এর বাইরে নয়। অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি উদ্ভিদের পাতার ক্ষতি করতে পারে, ব্যাহত করতে পারে সালোকসংশ্লেষণ। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সমুদ্রের ক্ষুদ্র ভাসমান জীব ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনও অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রতি সংবেদনশীল। অথচ এই অণুজীবগুলো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি এবং পৃথিবীর অক্সিজেন উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ওজোন স্তরের ক্ষতি শুধু আকাশের ওপরের কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়, এর সঙ্গে পৃথিবীর প্রায় সব জীবনের নিরাপত্তাই জড়িত।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্প ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। খাদ্য সংরক্ষণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, স্প্রে ক্যান ও শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য তৈরি হয় বিভিন্ন কৃত্রিম রাসায়নিক। এর মধ্যে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বা সিএফসি ছিল অন্যতম। সে সময় এসব রাসায়নিককে প্রায় আদর্শ উপাদান হিসেবে দেখা হতো। এগুলো তুলনামূলক সস্তা, সহজে আগুন ধরে না এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল। ফলে ফ্রিজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, অ্যারোসল স্প্রে ও শিল্পে ব্যবহৃত ফোমসহ নানা পণ্যে সিএফসি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা এসব রাসায়নিকের বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘমেয়াদি আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ভয়াবহ তথ্য পান। সিএফসি নিচের বায়ুমণ্ডলে সহজে ভেঙে যায় না। দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো ধীরে ধীরে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছায়। সেখানে সূর্যের তীব্র বিকিরণে সিএফসি ভেঙে গিয়ে ক্লোরিন পরমাণু মুক্ত করে। এই ক্লোরিন ওজোন অণুর সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে সেগুলো ধ্বংস করতে পারে। একটি ক্লোরিন পরমাণু পরপর বিপুলসংখ্যক ওজোন অণু ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়ায় সমস্যাটি দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে।

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে অ্যান্টার্কটিকার ওপরের বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরের অস্বাভাবিক ক্ষয় ধরা পড়ে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে ওজোনের ঘনত্ব এতটাই কমে যায় যে তৈরি হয় বিশাল ‘ওজোন গহ্বর’। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। পরিষ্কার হয়ে যায়, শিল্পোন্নয়নের আড়ালে মানুষের ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পৃথিবীর প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

এরপরই শুরু হয় নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কানাডার মন্ট্রিয়েলে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেন ‘মন্ট্রিয়েল প্রোটোকল অন সাবস্ট্যান্সেস দ্যাট ডিপ্লিট দ্য ওজোন লেয়ার’ নামে ঐতিহাসিক চুক্তিতে। এর মাধ্যমে ওজোন স্তর ধ্বংসকারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করার জন্য দেশগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তি ও উপাদানে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা করার অঙ্গীকার করে।

মন্ট্রিয়েল প্রোটোকলের সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের প্রায় সব দেশ এতে যুক্ত হয় এবং ওজোন স্তর ধ্বংসকারী সিএফসি ব্যবহারের অবসানে কাজ করে। এর ফলে ওজোন স্তরের ক্ষয় থামানো সম্ভব হয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেও এখন দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত ওজোন স্তর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ ওজোন স্তর আগের সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা।

তবে একটি পরিবেশগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সিএফসির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হাইড্রোফ্লুরোকার্বন বা এইচএফসি ওজোন স্তরকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না করলেও পরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। এসব গ্যাস শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে। ফলে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে যেন নতুন সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়টিও সামনে আসে।

এই পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে বিশ্বনেতারা মন্ট্রিয়েল প্রোটোকলে নতুন সংশোধনী গ্রহণ করেন, যা ‘কিগালি সংশোধনী’ নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য ছিল এইচএফসির ব্যবহারও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং এমন শীতলীকরণ প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা একই সঙ্গে ওজোন স্তর রক্ষা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় সহায়ক।

প্রতি বছর ওজোন দিবসের নানা কর্মসূচিতে তাই শুধু ওজোন স্তরের বিজ্ঞান নয়, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই শীতলীকরণ প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় আলোচনা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি। নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পুরোনো ফ্রিজ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দক্ষ কারিগরের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং এসব যন্ত্র পরিত্যাগের সময় পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। হাঁটা, সাইকেল চালানো বা গণপরিবহন ব্যবহারের মতো অভ্যাসও সামগ্রিক বায়ুদূষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ প্রযুক্তি ও নীতিকে সমর্থন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পরিবেশ দিবস নয়। এটি মানুষের তৈরি একটি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় মানুষেরই সম্মিলিত সাফল্যের গল্প। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে শোনা, দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা গেলে পৃথিবীর বড় পরিবেশগত সংকটও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, ওজোন স্তরের ইতিহাস তারই প্রমাণ। ১৬ সেপ্টেম্বর তাই শুধু ওজোনকে স্মরণ করার দিন নয়, পৃথিবীর অদৃশ্য এই সুরক্ষাকবচকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখার অঙ্গীকার নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার দিন।

কেএসকে

Original Source
https://www.jagonews24.com/feature/article/1157917
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Economy